দারিদ্র্য বিমোচনেই বড় সফলতা

জেলে পরিবারের মেয়ে রাশি রাজবংশী একসময় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। তাঁর বাবা ছিলেন প্রায়ান্ধ, কাজকর্ম তেমন একটা করতে পারতেন না। জীবিকার জন্য তাঁরা তিন বোনই টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেছিলেন। তবে ২০ বছর পরে এখন তাঁরা সেই অবস্থানে নেই। দিন বদলেছে, ভাগ্য ফিরেছে। রাশির স্বামী উপজেলা শহরে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে পরিবারে মোটামুটি সচ্ছলতা এনে দেন। যদিও কয়েক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। এতে অবশ্য রাশির সন্তানদের তাঁর মতো অন্যের বাড়িতে কাজ নিতে হয়নি। তাঁরা এখন তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

রাশি রাজবংশীর বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার দপ্তিয়র ইউনিয়নে। এটি মানিকগঞ্জ সীমান্তবর্তী এলাকা। একসময় যোগাযোগব্যবস্থা বলতে যেন কিছুই ছিল না। এই ইউনিয়নের গা ঘেঁষেই বয়ে গেছে প্রমত্ত যমুনা নদী। তাই এলাকাটি নদীভাঙনপ্রবণ। আছে ছোট ছোট অসংখ্য খাল। এমন এলাকায় যে পাকা সড়ক হতে পারে, তা একসময় ছিল অচিন্তনীয়। পার্শ্ববর্তী ভাদ্রা আর ধুবুরিয়া ইউনিয়নের অবস্থাও ছিল একই রকম।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কালক্রমে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থাই তিনটি ইউনিয়নের চিত্র বদলে দিয়েছে। পাকা সড়ক হওয়ার ফলে ওই সব এলাকা থেকে এখন ঢাকা আসা মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের ব্যাপার। জেলা শহর টাঙ্গাইলে যাওয়া ঘণ্টা দেড়েকের ব্যাপার। অথচ একসময় সেখান থেকে জেলা শহরে যেতেই প্রায় সারা দিন লেগে যেত। ঢাকায় আসাটাও ছিল সে রকম কঠিন। এখন বেশ কয়েকটি সড়ক ও সেতুর কল্যাণে যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার কল্যাণে আয়–উপার্জনের নানা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যেমন রাশির স্বামীর মতো অনেকেই শহরে গিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। সেখানকার কৃষিপণ্য শহরে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। গ্রামে অকৃষি খাতের বিকাশ ঘটে। গড়ে ওঠে সেবা খাত। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। সব মিলিয়ে বদলে যায় জীবনধারা, তৈরি হয় মোটরসাইকেল, টিভির মতো বিলাসী পণ্যের চাহিদা। তাই দপ্তিয়র বাজারে গড়ে ওঠে মোটরসাইকেল ও টিভির দোকান।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের দারিদ্র্য নিয়ে অনেক কথাই বলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার তো ‘বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, সহায়তা নিয়েই বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হবে। তবে এটা ঠিক, তখন এ দেশে দারিদ্র্য ভয়াবহ মাত্রায় ছিল। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৯০ শতাংশ। সেই বাংলাদেশই ২০১৮ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ১১ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়।

১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে সরকার দেশের গ্রামাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দেয়। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন সেবা পৌঁছে যায়, বিশেষ করে নারীদের কাছে। সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রচারণাও তাতে গতি পেয়েছে। সরকারের ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ (কাবিখা) কর্মসূচি গরিব মানুষের সন্তানকে বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে নিয়ে আসতে পেরেছে। ১৯৯০-এর পর এসব ঘটেছে। অন্যদিকে এই সময় সর্বজনীন উপবৃত্তির কারণে মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বেড়েছে। এই উপবৃত্তি কর্মসূচি এখন বিশ্বের অগ্রগণ্য কর্মসূচি হিসেবে গণ্য হয়।

বিশ্লেষকেরা বলেন, এনজিওগুলোর সামাজিক উন্নয়নের বাহক হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের নেতৃত্বস্থানীয় দেশ। এখানে এনজিওগুলো একদিকে সেবা পৌঁছে দেয়, অন্যদিকে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে খাবার স্যালাইনের কথা বলা যায়। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের দ্রুত বিস্তার এ ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। এতে গ্রামীণ নারীদের সামাজিক যোগাযোগ ও চলমানতা বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, নারীদের হাতে অর্থ এসেছে। এতে তাঁরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। বদৌলতে সমাজে নারীদের ক্ষমতায়ন ঘটেছে, অবদান বেড়েছে।

তৈরি পোশাক খাতের ভূমিকা তো আছেই। শ্রমঘন এই শিল্পে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান হয়েছে, যার বড় অংশ হচ্ছে নারী। পোশাক কারখানায় কাজ করে অনেকে দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছেন।

এ ছাড়া ধান, সবজি, ফল, মাছ উৎপাদনে অভাবনীয় উন্নতির কারণেও দারিদ্র্য বিমোচনে সফলতা এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। মুঠোফোন এবং মোবাইল ব্যাংকিংও নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

বিজ্ঞাপন

অনৈক্যের মাঝে ঐক্য

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সব সরকারই এসব খাতে কমবেশি গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশেষ সদ্ভাব ও ঐক্য না থাকলেও এ রকম কিছু ব্যাপারে দলগুলোর মধ্যে মিল রয়েছে। ১৯৭০–এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দারিদ্র্য বিমোচনে মতৈক্য তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

আরেকটি বিষয় দারিদ্র্য নিরসনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। সেটা হলো প্রবাসী আয়। ১৯৭০–এর দশকের শেষভাগ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়, তার বদৌলতে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় প্রবাসী আয়গ্রহীতা দেশগুলোর একটি। প্রবাসী আয়ের কারণে গ্রামের মানুষের হাতে টাকা এসেছে। এতে গ্রামাঞ্চলে অকৃষি ও সেবা খাতের বিকাশ ঘটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বড় রকম সফলতা এসেছে। তবে কোভিডের কারণে তাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। দারিদ্র্য আবার বেড়ে গেছে। সে জন্য তাঁর পরামর্শ হলো এখন নতুন চালিকা শক্তি খুঁজে বের করতে হবে। কৃষির আধুনিকীকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি—এসবের দিকে নজর দিতে হবে।

এমডিজি বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ যথেষ্টই সফল। তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কোভিড-১৯-এর আগে বাংলাদেশ যে গতিতে এগোচ্ছিল, তাতে এসডিজি অনুযায়ী ২০৩০ সালে দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অনায়াসে অর্জন করে ফেলত। কিন্তু এখন সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন