বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
৫০ বছরে দেশে উদ্যোক্তা শ্রেণি বিকাশে সরকারের নীতি সহায়তারও বড় ভূমিকা ছিল। আবার ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার পরিবেশ নিয়ে উদ্যোক্তাদের অভিযোগেরও শেষ নেই। দুর্নীতিকে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক খরচ হিসেবেই তাঁরা মেনে নিয়েছেন।

দেশ স্বাধীনের পরে

১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বৃহৎ শিল্প, ব্যাংক ও বিমা জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। এর আওতায় জাতীয়করণ করা হয় বিদেশি ব্যাংকের শাখা বাদে বাকি সব ব্যাংক, সাধারণ ও জীবন বীমা কোম্পানি (বিদেশি বিমা কোম্পানির শাখা বাদে), সব পাট, বস্ত্র ও সুতাকল, চিনিকল; অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌযানের বড় অংশ এবং ১৫ লাখ টাকা মূল্যের বেশি সব পরিত্যক্ত ও অনুপস্থিত মালিকানাধীন সম্পত্তি। এর মাধ্যমে আর্থিক ও শিল্প খাতের প্রায় ৯০ ভাগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল।

অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে এ সমাজতান্ত্রিক কাঠামো বেসরকারি উদ্যোক্তা বিকাশে সহায়ক ছিল না। আবার যুদ্ধবিধ্বস্ত তৎকালীন বাংলাদেশকে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে নিয়ে যাবেন, সেই বাস্তবতাও ছিল না। বাঙালি উদ্যোক্তাদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদও ছিল না। অধ্যাপক রেহমান সোবহান যেমনটা বলেছিলেন, ‘ধনতান্ত্রিক খাতে উচ্চতর পর্যায়ের বাঙালি বুর্জোয়াদের সঞ্চিত সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব কোথাও পাওয়া যায় না। সোভিয়েত গবেষক এস এস বারানভ, ১৯৭১ সালের আগে বৃহৎ বাঙালি ব্যবসায়ীদের মোট সঞ্চিত সম্পদ পরিমাপের একটি সাহসী প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলাফল যদিও সেটাকে একটা কাছাকাছি হিসাব ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে না। বারানভের গবেষণায় উল্লেখ করা আনুমানিক সম্পদের প্রায় ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার সম্পদই হচ্ছে পাটকলে বিনিয়োজিত পুঁজি এবং এর সিংহভাগই সংগৃহীত হয়েছিল সরকারি ঋণ এবং মূলধন (ইক্যুইটি) পুঁজির সাহায্যে। এসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর আরেকটি অন্যতম বিনিয়োগের ক্ষেত্র ছিল বস্ত্র কারখানা। বস্ত্র কারখানায় বিনিয়োজিত সম্পদ-মূল্যের আলাদা কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। উপরোল্লিখিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মোট ১১টি বস্ত্র কারখানার মালিক ছিলেন। যদি এসব কারখানার মোট সম্পদ-মূল্য আমরা ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকার সমান ধরি, তাহলে পাট এবং বস্ত্রশিল্প এ দুই খাতেই পুঁজির মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা অর্থাৎ এসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমগ্র স্থায়ী সম্পদের ৫৫ শতাংশ। ১৯৭২ সালের মার্চে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, যেসব পাটকল, বস্ত্রকল এবং একটি চিনিকল জাতীয়করণ করা হয়, তার মোট মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৯১ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ টাকার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে যে জাতীয়করণকৃত পরিসম্পদের ৪২ শতাংশই এসেছিল উপরোল্লিখিত ১৬টি ব্যবসায়ী পরিবারের সম্পদ থেকে।’

১৯৭২ সালে ব্যক্তি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা ছিল মাত্র ২৫ লাখ টাকা। ১৯৭৪ সালের ১৬ জুলাই এই সীমা বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হয়। ১৯৭৫–এর পরে জিয়াউর রহমানের সময় সীমা আরও বাড়িয়ে করা হয় ১০ কোটি টাকা। এর পরে ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করা হয়, গ্রহণ করা হয় উদার নীতি, বেসরকারি খাত নির্ভর উন্নয়নকে মূল নীতি হিসেবে নেওয়া হয়। নব্বইয়ের পরে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার করা হলে তা উদ্যোক্তা বিকাশে আরও সহায়ক হয়।

উদ্যোক্তার সজীব বিকাশ কতটা

হোরাশিও অ্যালজার ছিলেন ১৯ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের একজন। তাঁর লেখার ধরন অনুযায়ী হোরাশিও অ্যালজারের নামে একটি প্রবাদ বা মিথ চালু আছে। সেই মিথ অনুযায়ী, যে কেউ কঠোর পরিশ্রম করেই ধনী হতে পারে।
হোরাশিও অ্যালজারের উপন্যাস কিন্তু সে সময়ে মার্কিন সমাজকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছিল। তখন নানা ধরনের জটিল রাষ্ট্রীয় সমীকরণের কারণে মানুষের পক্ষে নিজের ভাগ্য নিজেই নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ধনী হতে নির্ভর করতে হতো অনেক কিছুর ওপর। তবু মানুষ টিকে থাকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যেত। কারণ, হোরাশিও অ্যালজারের নায়কেরা কঠোর পরিশ্রম করেই ধনী হতে পারছিল।

আশির দশকে রেহমান সোবহান লিখেছিলেন, ‘বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণিটি একটি সজীব বিকাশের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি—যেমনটি গড়ে ওঠে খুদে ব্যবসায়ী থেকে বৃহৎ ব্যবসায়ী এবং বৃহৎ ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি।’ তবে ৫০ বছরে এসে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কঠোর পরিশ্রম করে ছোট থেকে বড় শিল্পপতি হয়েছেন, এমন বেশ কিছু উদাহরণ আছে। তাঁদের বড় অংশই একসময় ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন, ব্যবসা থেকে আস্তে আস্তে পুঁজি বাড়িয়ে তবেই উৎপাদন খাতে গেছেন। বাংলাদেশের উদ্যোক্তা শ্রেণিকে এখন কয়েকটি ভাগে ভাগ করলে কঠোর পরিশ্রম করে ছোট থেকে বড় হওয়া অংশটি কম হলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে তাদের অবদান অনেক বেশি।

পাকিস্তান আমলের প্রথম বাঙালি ব্যবসায়ী নিজে একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। এ কে খান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেম খান চট্টগ্রামের এক সওদাগর পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। পরে শ্বশুরের অর্থে ব্যবসা করে বড় শিল্প গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। জহুরুল ইসলাম সামান্য কেরানির চাকরি করতেন। চাকরি ছেড়ে ঠিকাদারি ব্যবসা করে তিনি ওপরে উঠে এসেছিলেন। আকিজ গ্রুপের সেখ আকিজউদ্দিন একসময় কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে কমলালেবু বিক্রি করে প্রথম মূলধন সংগ্রহ করেছিলেন। মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামালের ব্যবসার প্রথম ঠিকানা ছিল রাস্তার পাশের এক টংদোকান। চট্টগ্রামের আবুল খায়েরের জীবনের প্রথম ব্যবসা ছিল মুদিদোকান, আর এখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত আবুল খায়ের গ্রুপ দেশের অন্যতম শীর্ষ গ্রুপ। একটি জেলা শহরে ঢেউটিনের দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন বাংলাদেশের ‘ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট’ ওয়ালটন-এর প্রতিষ্ঠাতা এস এম নজরুল ইসলাম। মালা শাড়ি খ্যাত আনোয়ার হোসেন মাত্র ১২ বছর বয়সে সংসার সামলাতে ১৫ টাকা বেতনে দোকানে বসতেন। স্যামসন এইচ চৌধুরীসহ চারবন্ধু মিলে পাবনায় একটি ওষুধের দোকান দিয়েছিলেন, স্কয়ার গ্রুপের যাত্রা সেখান থেকেই।

ব্যাংকঋণনির্ভর উদ্যোক্তা

রেহমান সোবহান লিখেছেন, ‘দেশভাগের পরে স্বল্পমাত্রার উদ্যোক্তার বিকাশ ঘটেছিল যখন আওয়ামী লীগ ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে তখন থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা লাভ করার পরে আওয়ামী লীগ প্রশাসন বাঙালি উদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা নেয়। তাদের বিশ্বাস ছিল পুঁজি সঞ্চয়ের মূল উপায় হচ্ছে আমদানি বাণিজ্য, তাই তারা আমদানিকারকদের তালিকায় বাঙালিদের কোটা বাড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এই উদ্যোগকে সাফল্যমণ্ডিত করার স্বার্থে তাঁরা ঢাকাতেই একটি আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ অফিস খোলেন, যাতে করে করাচি যাওয়ার খরচ এবং ঝামেলা কমে যায়।’
এর পরে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থা গঠন করা হয়েছিল। সংস্থার কাজ শুরুতে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তারা ঋণ দেওয়াও শুরু করে। সে সময় এই ঋণই উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

দেশ স্বাধীনের পরে বাংলাদেশেও একটি উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠেছে মূলত ব্যাংক থেকে ঋণনির্ভর হয়েই। এমনিতে মূলধনের প্রয়োজনে সবাইকে ব্যাংকের কাছে যেতে হয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শিল্প গড়ে পরে ফেরত দেওয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক রীতি। এ রীতি পালন করে বৃহৎ শিল্প গ্রুপ হিসেবে টিকে আছেন এমন সংখ্যাও কম নয়। শুরু থেকেই দেশের শীর্ষ ধনী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ইস্টার্ন গ্রুপের জহুরুল ইসলামের ব্যাংকঋণ ছিল প্রচুর। জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মনজুরুল ইসলাম ‘বিচিত্রা’য় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁদের গ্রুপের প্রচুর ব্যাংকঋণ। তাঁর প্রথম কাজ হবে এই ব্যাংকঋণনির্ভরতা কমিয়ে ফেলা। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ব্যাংক থেকে প্রচুর সহায়তা নিলেও কখনো খেলাপি হয়নি। ইউনাইটেড গ্রুপের নীতিই হচ্ছে ব্যাংকঋণনির্ভর না হওয়া। আবার প্রায় ৫০ বছর ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপ বেক্সিমকো নিয়ে সব আলোচনা-সমালোচনা ব্যাংকঋণকে কেন্দ্র করেই।

অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ প্রথম আলোতেই ‘লুম্পেন কোটিপতিদের উত্থানপর্ব’ নিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমার অনুসন্ধানে বাংলাদেশের নব্য ধনিক শ্রেণি গঠনের দ্বিতীয় পর্বে ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেয়েছি। প্রথম পর্বে ছিল লাইসেন্স, পারমিট, চোরাচালানি, মজুতদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা, সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে এর সঙ্গে যোগ হয় ব্যাংকঋণ ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ। ব্যাংকঋণের সুবিধা বাড়ে, ঋণখেলাপিও বাড়ে। ব্যবসা ও সরকারি ক্ষমতার মধ্যে যোগাযোগ ও চুক্তির নতুন বিন্যাস ঘটে। নব্য ধনিক শ্রেণির উপস্থিতি যত স্পষ্ট হতে থাকে, তত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় যাওয়ার হার বাড়তে থাকে, আবার এই হস্তান্তরে ধনিক গোষ্ঠীর সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়।’

ব্যাংকঋণ ফেরত না দিয়ে ধনী হওয়ার উদাহরণ অনেক। একশ্রেণির উদ্যোক্তার এটাই মূল কাজ। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা নামের দুটি বিশেষায়িত সংস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে খেলাপি ঋণের কারণে। গত ৫০ বছরের অসংখ্য আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণ ছিল ব্যাংকঋণ। আশির দশকে ব্যাংকঋণকেন্দ্রিক কেলেঙ্কারির কাহিনি নিয়ে লেখা হয়েছিল ‘ধনিকগোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনি’। এখন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণই ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। আর অবলোপন করা ঋণ ধরলে তা হবে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।

১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘ধনিকগোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনি’ বইয়ের ভূমিকায় বলা হয়েছিল, ‘আমাদের দেশের রুই-কাতলা ধনিক শ্রেণির একটি অংশ আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া হিসেবে পরিচিত। উৎপাদনবিমুখ, বিনা শ্রমে সম্পদশালী হওয়ার উচ্চাভিলাষী এই গোষ্ঠী মূলত সরকারের উচ্চ মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে, বিভিন্ন ব্যবসা বাগিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমায় লুটপাট চালিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠার নাম করে ঋণ নিয়ে শিল্প গড়ছেন না বরং ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে কিংবা অন্য ব্যবসায় লাগিয়ে দেদার অর্থ উপার্জন করছেন। অথচ ব্যাংকের ঋণ তাঁরা শোধ দিচ্ছেন না।….এভাবে জনগণের টাকা অবাধে স্থায়ীভাবে লুটপাট করার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশে একটি সর্ব সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে উঠেছে।’

বইটির দুই লেখক মতিউর রহমান ও সৈয়দ আজিজুল হক শুরুতেই লিখেছিলেন, ‘দেশের একশ্রেণির অর্থলোলুপ ও অসৎ ব্যবসায়ী সরকারি টাকা লুটেপুটে খাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে দেশের ধনিক রাঘববোয়ালদের ৯টি গ্রুপ সরকারের প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে এ বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে ফেরত দেয়নি। ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।’

উদ্যোক্তা বিকাশে পোশাক খাত

১৯৭৮ সালের ২৮ জুলাই ফ্রান্সে প্রথম ১০ হাজার শার্ট রপ্তানি করে রিয়াজ গার্মেন্টস। সেই অর্থে দেশের পোশাকশিল্পের প্রথম উদ্যোক্তা রিয়াজউদ্দিন। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত এ খাতের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। বরং একই বছরে দেশে প্রথম ১০০ ভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা দেশ গার্মেন্টস গড়ে তুলে পোশাক খাতকে পথ দেখিয়েছিলেন সাবেক আমলা নুরুল কাদের। তবে নুরুল কাদের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর নুরুল ইসলাম মিলে যে দুটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটাই ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের জন্য পথ খুলে দিয়েছিল। এই দুই নীতি হচ্ছে বিলম্বে দায় পরিশোধের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা এবং বিনা শুল্কে কাঁচামাল আমদানি করার বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা। এ দুই সুবিধার কারণেই বড় অঙ্কের পুঁজি ছাড়াই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল অজস্র পোশাক কারখানা, সৃষ্টি হয়েছিল বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তার।

যাঁদের হাত ধরে পোশাক খাতের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সবাই যে টিকে গেছেন তা কিন্তু নয়। একসময় পোশাকশিল্পে বড় নাম ছিল আজিম-মান্নান গ্রুপ। অর্থাৎ মেজর (অব.) মান্নান ও মোহাম্মদ ফজলুল আজিম। দুজনই পরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। আজিম-মান্নান গ্রুপ এখন আর পোশাক খাতের বড় নাম নয়। এমনকি তাঁদের এখন আর সফল উদ্যোক্তাও বলা যাবে না। একইভাবে আনিসুর রহমান সিনহার কথা বলা যায়। পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় গ্রুপ সিনহা গ্রুপের কথাও হয়তো একদিন কেউ আর মনে রাখবেন না।

আবার এ খাতে অনেক বড় নামও আছে। এর মধ্যে একদল আছেন, যাঁরা তৈরি পোশাকের বাইরে আর পা বাড়াননি। আরেক দল নানা খাতে নিজেদের উদ্যোগকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ পর্যায়ে কিছু নাম নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। মোহাম্মদী গ্রুপের আনিসুল হক ঢাকার মেয়র হয়ে পোশাক ব্যবসায়ীদের রাজনীতির নতুন পথ দেখিয়ে গেছেন। চট্টগ্রামের প্যাসিফিক গ্রুপের মো. নাছির উদ্দিন এখনো পোশাক খাতের অন্যতম বড় উদ্যোক্তা। এনভয় গ্রুপের কুতুবউদ্দিন আহমেদ কেবল পোশাক খাতেই আটকে নেই। বস্ত্র খাতের বড় নাম এখন বাদশা মিয়া, ফকির গ্রুপের ফকির ইউসুফ আলী, হা-মীম গ্রুপের এ কে আজাদ প্রমুখ। মাত্র ৬৭ টাকা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। ইসলামপুরের বিক্রয়কর্মী হিসেবে দোকানে দোকানে পণ্য নিয়ে যেতেন। সেই নুরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠা করা নোমান গ্রুপ দেশের পোশাক ও বস্ত্র খাতের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা। আবার পোশাক খাত দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও চার ভাইয়ের দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড বা ডিবিএল ছড়িয়ে পড়েছে টাইলস, তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা খাতে।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান ২০০২ সালে ‘বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ নিবন্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন, গত ১৫ বছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে আসা দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের নিট মুনাফা হয়েছে। এ উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ উদ্বৃত্ত তাহলে কোথায় বিনিয়োগ হয়েছে? রেহমান সোবহান এ নিয়ে বলেছেন, ‘সন্দেহ নেই, এর কিছু অংশ এ খাতের ভেতরেই বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিংবা নতুন বস্ত্র মিলে তা খাটানো হয়েছে যেগুলো উৎপাদনে নেমেছে। তবে বেশির ভাগ বস্ত্র কারখানারই অর্থায়ন হয়েছে পুঁজিবাজার আর ব্যাংক থেকে ধারের মাধ্যমে। সুতরাং নতুন বিনিয়োগ তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্বৃত্ত থেকে অল্পই গ্রহণ করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রচেষ্টা চালিয়ে এ সেক্টরে বিনিয়োগ উদ্বৃত্ত নিয়ে কী ঘটছে তার ওপর বিস্তারিত তদন্ত চালাতে পারে, খুঁজে বের করতে পারে এ উদ্বৃত্তের কত অংশ দেশে–বিদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা আর নজরকাড়া অপচয়ের বাইরে উৎপাদন বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়েছে।’

পোশাক খাতের বয়স এখন ৪২ বছর। পোশাক খাত নিয়ে এ গবেষণা এখনো হতে পারে।

পোশাকের বাইরে

এস এস বারানভ যে ১৬ পরিবারের তালিকা দিয়েছিলেন, ৫০ বছরে তাদের বড় অংশেরই আর অস্তিত্ব নেই। বিশেষ করা যাঁরা পাটকলকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা ছিলেন, তাঁরা পরবর্তী জীবনে আর টিকে থাকতে পারেননি। প্রথমত, স্বাধীনতার পরে জাতীয়করণ করার পরে অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দেন। পরে সরকার বেসরকারি হাতে ছেড়ে দিলেও তত দিনে অর্থনীতিতে পাটশিল্প গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। তবে কেউ কেউ ঠিকই পাটশিল্প থেকে বেরিয়ে এসে নতুন উদ্যোগে যুক্ত হয়ে সফল হয়েছেন। যেমন খান বাহাদুর মুজিবর রহমানের পুত্র লতিফুর রহমানের ট্রান্সকম গ্রুপ।

একসময় ভোগ্যপণ্যের একচেটিয়া ব্যবসা ছিল চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের। সেই জায়গাও হারিয়েছে তারা। সুফি মিজানুর রহমানের পিএইচপি গ্রুপ এবং দুই ভাই মোহাম্মদ আবু তৈয়ব ও মোহাম্মদ আবুল কালামের টিকে গ্রুপ ভোগ্যপণ্যের বাইরে আরও নানা দিকে ব্যবসা বাড়িয়েছে। আর ভোগ্যপণ্যের বাজারে চট্টগ্রামের একচেটিয়া ব্যবসা ভেঙে বড় আকারে স্থান করে নিয়েছেন সিটি গ্রুপের ফজলুর রহমান ও মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল। ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় এখনো নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসছেন।
পাট, বস্ত্র, পোশাক ও ভোগ্যপণ্যের বাইরে এখন কৃষি ও খাদ্যপণ্যেও বিনিয়োগ বাড়ছে। বড় চাকরি বা শিক্ষকতা ছেড়ে বড় উদ্যোক্তা হয়েছেন এসিআই গ্রুপের এম আনিস উদ দৌলা ও কাজী ফার্মস-এর কাজী জাহেদুল হাসান। আবদুল আউয়াল মিন্টু রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় হলেও তিনি মনে থাকবেন শাকসবজিসহ কৃষিপণ্যের উদ্যোক্তা হিসেবে। চামড়াজাত পণ্যে দেশের সবচেয়ে বড় উদ্যোক্তা সৈয়দ মনজুর এলাহী। এস এম নজরুল ইসলাম ও তাঁর ছেলেদের ওয়ালটন গ্রুপের কথা আগেই বলা হয়েছে।

দুজন উদ্যোক্তার কথা এ পর্যায়ে উল্লেখ করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার আগে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে দখল ছিল মূলত অবাঙালি ব্যবসায়ীদের। স্বাধীনতার পরে তাঁরা প্রায় সবাই চলে গেলেও থেকে গেল দুটি গ্রুপ। ইস্পাহানি পরিবার ও আকবর আলী আফ্রিকাওয়ালা পরিবার। চা ও ইস্পাত শিল্পে এখনো প্রবল রাজত্ব এই দুই পরিবারের।

সরকার যখন সহায়

বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথপ্রদর্শক সামিট গ্রুপের মুহাম্মদ আজিজ খান এবং ইউনাইটেড গ্রুপের হাসান মাহমুদ রাজা। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রসার ঘটলে এ খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। এ বিনিয়োগের পুঁজি এসেছে মূলত ব্যাংকঋণ থেকেই। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে নতুন নতুন উদ্যোক্তার দেখা মিললেও তারা মূলত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কই তাদের বড় সহায়। আবার অভিজ্ঞতা ছাড়া এ খাতে বিনিয়োগ করতে গিয়ে সংকটে পড়ে গেছে, এমন উদাহরণও আছে। যেমন অটবি ও রহিমআফরোজ গ্রুপ।

দেশে আরেক ধরনের উদ্যোক্তা আছেন, যাঁদের সহায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পেশিশক্তি। ভূমি ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদশালী হয়েছেন এ ধরনের উদ্যোক্তারাই। আনু মুহাম্মদ ‘লুম্পেন কোটিপতিদের উত্থানপর্ব’ নিবন্ধে এ ধরনের উদ্যোক্তাদের নিয়েই হয়তো বলেছিলেন, ‘যথাযথ অনুসন্ধানে দেখা যায়, এখন আমরা প্রবেশ করেছি বিত্তায়নের তৃতীয় পর্বে, যখন ব্যাংকঋণের মধ্যে সম্পদ লুণ্ঠন সীমিত নেই। আকাঙ্ক্ষা ও সুযোগ দুটিই এখন অনেক বেশি। তাই পুরো ব্যাংক খেয়ে ফেলা, এমনকি সর্বজনের সব সম্পদই এখন বাংলাদেশে এই শ্রেণির কামনা-বাসনার লক্ষ্যবস্তু। বৃহৎ চুক্তিতে বৃহৎ কমিশন, জমি-নদী-খাল-বন দখল, সর্বজনের সম্পদ আত্মসাৎ, মেগা প্রকল্পে মেগা চুরির রাস্তা তৈরিসহ পুরো দেশই এখন ভোগ্যবস্তু।’

শেষ কথা

সন্দেহ নেই গত ৫০ বছরে দেশে উদ্যোক্তা শ্রেণি বিকাশে সরকারের নীতি সহায়তারও বড় ভূমিকা ছিল। আবার ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার পরিবেশ নিয়ে উদ্যোক্তাদের অভিযোগেরও শেষ নেই। দুর্নীতিকে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক খরচ হিসেবেই তাঁরা মেনে নিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে আগামী বছরগুলোতেও কি একই ধরনের পরিবেশ ও পরিস্থিতি থাকবে?
আবার ৫০ বছরে অনেক উদ্যোক্তা পরিবারেই দ্বিতীয় প্রজন্ম দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় প্রজন্মও চলে এসেছে। নতুন প্রজন্মের সবাই কি সামনে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য অর্জন করেছেন? দেশের উদ্যোক্তা পরিবারগুলোর সামনে এটাও বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন