বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ এত দিন কম মজুরির ভিত্তিতে বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রেখেছে। বস্তুত, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মজুরি সবচেয়ে কম। এতে যেমন শ্রমিকদের দক্ষতার উন্নয়ন হচ্ছে না, তেমনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কম মজুরি দিয়ে বাংলাদেশ বেশি দিন আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। সে জন্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। ব্যবসার খরচ কমিয়ে শাসনব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে। তাতে সহজে ব্যবসার সূচকে দেশের উন্নতি হবে এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।

সুশাসন

সাধারণত একটি দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কী পরিমাণ বিনিয়োগ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁরা নেন বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা করার সূচকের ভিত্তিতে, যদিও কিছু অনিয়মের অভিযোগে সেই সূচক প্রকাশ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগকারীরা ব্যবসার পরিবেশেই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। গ্লোবাল কম্পিটিটিভ রিপোর্ট বা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা প্রতিবেদনের সূত্রে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। কম্পিটিটিভ প্রতিবেদনের লক্ষ্যে পরিচালিত জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৭২ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারী আমলাতন্ত্রের অদক্ষতাকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এরপর আছে যথাক্রমে দুর্নীতি, অর্থায়নের সমস্যা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, উচ্চ কর, শ্রমিকদের অদক্ষতা, কর্মস্থলে নৈতিকতার ঘাটতি ও নীতিগত অস্থিতিশীলতা। এ ছাড়া যেসব খাতে উন্নতি করা দরকার বলে তাঁরা মনে করেন সেগুলো হলো, জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আইনের শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ।

অবকাঠামো

ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে আরেকটি বড় বাধা অবকাঠামো। স্বাধীনতার পর দেশে সড়ক যোগাযোগের বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, এখন দেশের যেকোনো জায়গা থেকে দিনে দিনে রাজধানীতে আসা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোতে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে। সে কারণে এশিয়ার অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো আমদানি-রপ্তানিতে পিছিয়ে আছে। এশিয়া অঞ্চলে যেখানে রপ্তানি বাণিজ্যে গড়ে ১৮ দিন সময় লাগে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করতে সময় লাগে ২৮ দিন। আমদানির বেলায় যা যথাক্রমে ২০ ও ৩৪ দিন। রপ্তানি বাণিজ্যে দেশে কনটেইনারপ্রতি খরচ ১ হাজার ২১৮ ডলার, ভারত ব্যতীত এশিয়ার মধ্যে যা সর্বোচ্চ। আর আমদানিতে কনটেইনারপ্রতি খরচ পড়ে ১ হাজার ৫১৫ ডলার, এশিয়ার মধ্যে যা সর্বোচ্চ। এই পরিমাণ খরচের কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশে আমদানি করা পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যায়। এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাস্তবতায় অবকাঠামো খাতে উন্নয়নে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৩২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৭ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা (১ ডলার = ৮৫ টাকা) বিনিয়োগ করতে হবে। এটা অবশ্য বিশ্বব্যাংকের আইএফসি বা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের হিসাব। এই বিনিয়োগযজ্ঞ সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব হবে না। তাই এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে সরকার বিনিয়োগের একটি সীমায় পৌঁছে গেছে। এ ছাড়া সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সীমিত। অথচ দেশে অবকাঠামো প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো অনেক কম—জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবেদনের পরামর্শ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারকে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মোদ্দা কথা, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী পর্যায়ে টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার কৌশল বাংলাদেশকেই খুঁজে নিতে হবে। সে জন্য অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু পরামর্শ এই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বড় ব্যবসায়ীরা এ উচ্চ খরচের সঙ্গে একভাবে মানিয়ে নিলেও উদীয়মান ব্যবসায়ীদের জন্য এটি বড় বাধা। আর এলডিসি উত্তরণের পর ব্যবসা-বাণিজ্যের উচ্চ খরচ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সে জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে যেমন জোর দিতে হবে, তেমনি মনিটরিং জোরদার করতে হবে। শাসনব্যবস্থার উন্নতি না হলে অনানুষ্ঠানিকভাবে সমস্যার সমাধানে মানুষ উৎসাহিত হয়। কিন্তু এখন অবকাঠামো উন্নয়নে যত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সুশাসনে ততটা দেওয়া হচ্ছে না।

ভবিষ্যৎ পথপরিক্রমা

নানা বাধাবিপত্তি নিয়েই বাংলাদেশ এত দূর এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও এই রপ্তানিমুখী উৎপাদন শিল্পের হাত ধরেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ, এটাই হবে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মূল উৎস। তবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ হ্রাসের পাশাপাশি বাজারব্যবস্থা আরও সক্রিয় করতে হবে। সে জন্য প্রযুক্তির বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রযুক্তি গ্রহণে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে প্রত্যেক কর্মীর উৎপাদনশীলতা গড়ে ৩ শতাংশ বাড়বে। আর ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।

তবে করোনাভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে বাংলাদেশ যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তার প্রশংসা করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন