বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বঙ্গভঙ্গের পর গত শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিল্লায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। তখন কুমিল্লায় চকবাজারের পাশাপাশি রাজগঞ্জ বাজারের গোড়াপত্তন হয়। দশকের পর দশক কুমিল্লা নগরবাসীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন এই বাজারের ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে প্রবীণ ব্যবসায়ী ও কুমিল্লা দোকান মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শতবর্ষী এই বাজারে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সব মিলবে। বাজারের লিস্ট নিয়ে যাবেন, খালি হাতে ফিরতে হবে না।’ তিনি জানান, রাজগঞ্জ বাজারে দৈনিক চার-পাঁচ কোটি টাকার পণ্য বেচাকেনা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে রাজগঞ্জ বাজারে বৈচিত্র্যময় ও বহুমাত্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের চিত্র দেখা গেছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে থানার সামনের গেট দিয়ে ঢুকতেই মিলল মুদিদোকানের সারি। ১০ ফুট বাই ৮ ফুট মাপের শ খানেক মুদিদোকানে হাঁকডাক দিয়ে বেচাকেনা চলছিল। দিন কি রাত বোঝার উপায় নেই। প্রতিটি দোকানেই লাইট জ্বলছে। চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, তেল, মরিচ, রসুন, গুঁড়া দুধসহ মনিহারি জিনিসপত্র রয়েছে দোকানগুলোতে।

স্যাঁতসেঁতে গলি ধরে একটু এগোতেই এলাহী এন্টারপ্রাইজ। কথা হলো প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কবির আহমেদের সঙ্গে। মধ্যবয়সী কবির আহমেদ জানান, তিন প্রজন্ম ধরে রাজগঞ্জেই তাঁরা মুদিদোকান করছেন। তাঁর দাদা হারুন অর রশিদ সাবেক পাকিস্তান আমলে রাজগঞ্জ বাজারে মুদি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। আশির দশকের শুরুতে কবির আহমেদের বাবা হাজী মতিন মিয়া এই ব্যবসায় আসেন। এখন এলাহী এন্টারপ্রাইজের হাল ধরেছেন তিনি নিজে।

কবির আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, প্রায় ষাট বছর ধরে তাঁরা মুদি ব্যবসায়ে আছেন। পাড়া-মহল্লার দোকানের চেয়ে এখানে দাম কিছুটা কম। তাই রাজগঞ্জ বাজারে ক্রেতার অভাব থাকে না।

এলাহী এন্টারপ্রাইজের পাশে কয়েকটি দোকান পরেই ইসলাম স্টোর। ইসলাম স্টোরের মালিক রফিকুল ইসলাম জানান, ১৯৭৪ সালে তাঁর বাবা আবদুল মজিদ মুদি ব্যবসাটি শুরু করেছিলেন।

মুদিপট্টি ছাড়িয়ে একটু এগোলেই মাংসপট্টি। সেখানে ১৫-২০টি দোকান। সেখানে গরু–খাসির মাংস ও মুরগি পাওয়া যায়। আপনি গিয়ে অর্ডার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কসাই আপনাকে মাংস কেটে দেবেন, মুরগি বিক্রেতা মুরগি বানিয়ে দেবেন।

রাজগঞ্জ বাজারের ১ নম্বর গেটের পাশে ফল ও সবজিপট্টি। গেটের শুরুতেই ফলমূলের দোকান। এরপর থরে থরে সাজানো শাক-সবজির ৩০-৪০টি দোকান, যেখানে সারা দিন চলে আনাজের কারবার। দর হাঁকিয়ে আওয়াজ তোলেন বিক্রেতারা। মৌসুম বদলানোর এই সময়ে শীতকালীন বাহারি সবজি ইতিমধ্যে উঠতে শুরু করেছে। সবজিপট্টির পাশেই মাছবাজার। কোন মাছ নেই এখানে? পাঙাশ, রুই, তেলাপিয়া, কই, শোল, চিংড়ি, মলা–ঢেলা সবই যাওয়া যায়।

সবজি ও মাছপট্টির পরেই দুধের বাজার। দুধওয়ালারা সারি বেঁধে দুধের বড় পাত্র নিয়ে বসে থাকেন ক্রেতার অপেক্ষায়। আপনি শুধু আপনার চাহিদামতো কিনে নেবেন। দুপুর বেলায় গিয়েও ১৫-২০ জন দুধওয়ালার দেখা মিলল। দুধ বিক্রেতা আবদুল হালিম জানালেন, প্রতিদিন গড়ে ১০-১২ লিটার দুধ বিক্রি করেন তিনি।

default-image

নিত্যপণ্যের বাজার ছেড়ে এবার ঢুঁ মারলাম খেলনাপট্টিতে। এই পট্টিতে হরেক রকমের প্লাস্টিকের খেলনার দোকান। বাহারি রঙের সাজানো খেলনার ভারে দোকানের অবয়বই যেন হারিয়ে গেছে। হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, ব্যাট-বলের বিরাট সমাহার প্রতিটি দোকানে। প্রায় হারিয়ে যাওয়া লাটিমের দোকানের দেখাও মিলল সেখানে। কবির হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, কুমিল্লা শহরের শতবর্ষী রাজগঞ্জ বাজারে তিনি ১৮ বছর ধরে লাটিম বেচাকেনা করেন। মেসার্স কবির স্টোর নামে ১০ ফুট বাই ৮ ফুট দোকানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে লাল-সবুজ-হলুদ রঙের লাটিমের কারবার।

কবির হোসেন প্রথম আলোকে জানান, তাঁর দোকানে পাইকারিতে ৩০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় ১০০ লাটিম বিক্রি হয়। খুচরায়ও লাটিম বিক্রি করেন। কুমিল্লা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে দোকানদারেরা লাটিম কিনে নিয়ে যান। তিনি জানান, করোনার আগে প্রতিদিন ৮-১০ হাজার টাকার লাটিম বিক্রি হতো। এখন তা কমে দুই-তিন হাজার টাকায় নেমে এসেছে।

স্টেশনারি পট্টিতে গেলে মনে হবে, আপনি বই, খাতা-কলমের দুনিয়ায় চলে এসেছেন। কাঁচাবাজার করতে এসে সন্তানের শিক্ষা উপকরণও কিনতে পারেন নগরবাসী। রাজগঞ্জে পাবেন সাবান-সুগন্ধিসহ যাবতীয় প্রসাধনসামগ্রী। এক গলির পুরোটাই প্রসাধনসামগ্রীর পাইকারি দোকান।

রাজগঞ্জ বাজারে নিত্যপণ্যের বাইরে পোশাক-আশাক, জুতা, ঘড়ি, এমনকি দা-বটির ব্যবসাও আছে। মোট কথা, রাজগঞ্জ বাজারে গেলে আপনাকে খালি হাতে ফিরতে হবে না। এক ঘণ্টা রাজগঞ্জ বাজারে ঘোরাঘুরি করে রাজবাড়ী গেট দিয়ে বের হয়ে এলাম। এই গেটের সামনেই ১৫-২০টি অটো রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। রাজগঞ্জের প্রতি গেটের সামনেই এভাবে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করে অটোরিকশাগুলো। কারণ, ব্যাগভর্তি কেনাকাটা করে বাসায় ফিরতে তো ক্রেতাদের জন্য এই অটোরিকশাওয়ালারাই ভরসা।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন