শ্রমবাজারে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ

স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশে অর্থনীতির পট পরিবর্তনে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। এই পাঁচ দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনের সফলতায় বড় অবদান রেখেছেন নারীরা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে এসে এখন গর্ব করে বলা যায়, পাকিস্তানকে যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেছনে ফেলেছে, তার একটি হলো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশ, যা পাকিস্তানে ২৩ শতাংশ।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে দেশে কর্মক্ষেত্রে নারী ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। এই হার ১৯৮০ সালের দিকে ৮ শতাংশ ও ২০০০ সালে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশে ওঠে। তবে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার ২০১০ সালে বেড়ে ৩৬ শতাংশ হয়। ২০১৩ সালে অবশ্য কিছু কমে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামে। বিবিএসের সর্বশেষ ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে নারী হিস্যা ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তির আকার ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে ৬ কোটি ৮ লাখ মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন। মোট শ্রমশক্তিতে ৪ কোটি ২২ লাখ পুরুষ আর নারী ১ কোটি ৮৭ লাখ।

বিজ্ঞাপন

কর্মক্ষেত্রে নারী

স্বাধীন দেশের শ্রমবাজারে ধীরে ধীরে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। তবে শ্রমবাজারে নারীর একটা বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক বা নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। গত ৫০ বছরে নারীরা দেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গত বছরের এক গবেষণায় বলা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। তবে সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরা হলে নারীর অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী-পুরুষের অবদান বলা যায় সমান সমান। বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৭ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা—অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে কাজ করছেন। তবে উৎপাদনব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নারী কর্মীদের সিংহভাগই শ্রমজীবী। বাকিরা শিক্ষকতা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা পেশায় যুক্ত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীসহ বিভিন্ন উচ্চপদেও দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। তবে শ্রমবাজারে নারীর একটা বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। যেমন কর্মজীবী নারীদের অর্ধেকের বেশি কৃষিকাজে সম্পৃক্ত। আরেকটি বড় অংশ পোশাকশিল্পে কাজ করে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ কম। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী আছেন। তবে উপসচিব থেকে সচিব পর্যায়ে নারীর সংখ্যা ১ শতাংশ বা তারও কম। দেশে সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদেও নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম।

তৈরি পোশাক খাতে নারী

দেশে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলতে হলে প্রথমেই আসে পোশাক খাতের নাম। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতির যাত্রা শুরু হয়। তৈরি পোশাকশিল্পের অভিযাত্রা ও বিকাশের ফলে কয়েক বছরের মধ্যে অর্থনীতির চেহারা পাল্টাতে শুরু করে। বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পোশাক খাতের অবদান ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এখানে কাজ করে। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশই আসে পোশাক খাত থেকে। এই তথ্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি)।

তৈরি পোশাক খাতে নারীর অংশগ্রহণের শুরুটা হয় সত্তরের দশকে। শুরুটা হয় রিয়াজ গার্মেন্টস দিয়ে। এটি দেশের পোশাকশিল্পের অগ্রপথিক। ১৯৭৩ সালে রিয়াজ উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ী এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে দেশের বাজারেই বিক্রি হতো এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক। প্রতিষ্ঠার ৫ বছর পর ১৯৭৮ সালে প্রথম তারা ফ্রান্সে ১০ হাজার শার্ট রপ্তানি করে। সেটিই দেশের প্রথম পোশাক রপ্তানি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক রিয়াজ উদ্দিন গোড়া থেকেই নারীদের নিয়ে কাজ করতে উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু তখনকার সামাজিক অবস্থা ততটা অনুকূলে না থাকায় বিষয়টি অসম্ভব হয়ে পড়ে। সে জন্য রিয়াজ উদ্দিন নিজের মেয়েকেই পোশাক কারখানায় পোশাক তৈরির কাজে লাগিয়ে দেন। এরপর থেকে নারীরা ধীরে ধীরে পোশাকশিল্পের কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই খাতে কাজ করা ৪০ লাখ শ্রমিকের ৫৯ দশমিক ১২ শতাংশ নারী।

জানতে চাইলে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত ৫০ বছরে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। প্রচলিত ও অপ্রচলিত সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। নারীরা এখন ঘরে-বাইরে বেতনভুক্ত কাজ করতে আগ্রহী। ফলে নারীদের বেকারত্ব ও অর্ধবেকারত্বের হার কমে আসছে। উদ্যোক্তা হিসেবেও বড় একটা জায়গা করে নিয়েছেন নারীরা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারীরা যে সব ধরনের কাজেই যুক্ত হতে পারেন, তা এখন প্রমাণিত। যদিও বিশেষ প্রশিক্ষণ বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি অনেক কম।

সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের কারণে নারীরা উচ্চশিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন, এটাও একটা বাস্তবতা। ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অর্থনীতির গতিময়তা বজায় রাখতে হলে নারীদের কর্মসংস্থানের হার আরও বাড়াতে হবে। নারীদের একটি বড় অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম। তাঁদের শ্রমবাজারে আনতে হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে না পারলে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না।

বিজ্ঞাপন
অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন