default-image

করোনায় দেশের পণ্য রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চাহিদা কম থাকায় অনেক পণ্যের রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তবে ক্রয়াদেশ পেয়েও রপ্তানি না করতে পারার ঘটনাও আছে। সৌদি আরবে হিমায়িত মাছ রপ্তানির ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছে। গত নভেম্বর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছ রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণেই মূলত সৌদি আরবে মাছ রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। তাঁরা বলেন, হিমায়িত মাছ রপ্তানির জন্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সৌদি ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অথরিটিতে (এসএফডিএ) নিবন্ধিত হতে হয়। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয় উভয় দেশের সরকারি পর্যায়ে। এক মাসে আগে মৎস্য অধিদপ্তর রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। কিন্তু সেখানেই বিষয়টি আটকে আছে।

বিজ্ঞাপন

সৌদি আরব ছাড়াও বাংলাদেশের নদী, খাল–বিল, হাওর–বাঁওড় ও পুকুরের মাছ মধ্যপ্রাচ্যের ওমান, কাতার, দুবাই, বাহরাইন এসব দেশেও রপ্তানি হচ্ছে। মাছের মধ্যে রয়েছে কাঁচকি, বাতাসি, মলা, ঢেলা, পুঁটি, বাটা ইত্যাদি। প্রবাসী বাংলাদেশিরাই মূলত এসব মাছের ভোক্তা। সাত-আট বছর আগেও সৌদিতে বিপুল পরিমাণ মাছ রপ্তানি হতো, যা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমেছে। কারণ, নানাবিধ জটিলতায় সৌদিতে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। তারপরও বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে মাসে ৭-৮ কনটেইনার মাছ রপ্তানি হতো।

পবিত্র রমজান মাস ও হজ উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি মাছ রপ্তানি হয় সৌদিতে। গতবার করোনার কারণে ব্যবসায় মার খেয়েছে। চলতি বছরে এসে নিষেধাজ্ঞার কারণে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। সরকারি পর্যায়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে মাছ রপ্তানির জট খুলবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) তথ্যানুযায়ী, সৌদিতে গত ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ কোটি ডলার করে হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি হয়। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ ডলার। মোট রপ্তানির ৯৯ শতাংশই মাছ। কালেভদ্রে কিছু হিমায়িত চিংড়ি যায়।

রপ্তানিকারকদের সূত্রে জানা যায়, সৌদিতে মাছ রপ্তানিতে জটিলতার শুরু তিন বছর আগে। বাংলাদেশ ২০১৩ সাল থেকে চাষ করা মাছের স্বাস্থ্যগত অবস্থা–সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করছে না বলে অভিযোগ করে আসছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সে অনুযায়ী ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে চাষের মাছ আমদানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটি। অবশ্য তার আগেই বিষয়টি সুরাহার জন্য এসএফডিএ একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের স্বাদু পানির মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার পরিদর্শনে আসার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত ওই প্রতিনিধিদলকে আনতে পারেনি।

চাষের মাছ রপ্তানি বন্ধ হলেও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ সৌদি আরবে রপ্তানি হচ্ছিল। কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এসএফডিএতে নিবন্ধিত না হওয়ায় তারা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। শুরুতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়িত্বে নিবন্ধন নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে তারা বিএফএফইএর দ্বারস্থ হয়। সংগঠনটির তরফ থেকে দুই দফায় ২৩ প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা মৎস্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। অধিদপ্তর আরও ১১টি প্রতিষ্ঠান বাছাই করে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা পাঠিয়ে এসএফডিএতে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি লেখেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী শামস আফরোজ। ইতিমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এফএফডিএতে নিবন্ধন করে রপ্তানি অব্যাহত রেখেছেন।

বিজ্ঞাপন

বিএফএফইএর সহসভাপতি আশরাফ হোসেন মাসুদ গত সোমবার বলেন, ‘এসএফডিএতে নিবন্ধনের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের তিন দফা বৈঠক হয়েছে। তাঁরা যথেষ্ট আন্তরিক। তবে নিবন্ধনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অজানা কারণে বিলম্ব করছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের দুই কনটেইনার মাছ রপ্তানির সব প্রস্তুতি আছে। তবে নিবন্ধন না থাকায় রপ্তানি আটকে আছে। এতে ৯৬ হাজার ডলারের মাছ রপ্তানি অনিশ্চয়তায় রয়েছে।’

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসএফডিএর নিবন্ধনের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠিয়ে দিয়েছি। প্রটোকল অনুযায়ী মন্ত্রণালয় বাকি কাজ করবে।’

মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মাহবুবা পান্না গতকাল বলেন, ‘লোকবল–সংকটের কারণে আমার দপ্তরে অনেকগুলো ফাইল পড়ে আছে। তার মধ্যে এটি থাকতে পারে। ফাইল না দেখে বিস্তারিত বলতে পারছি না।’

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন