অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে কেনাকাটা করলে পণ্যের দাম মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল তথা মুঠোফোনে আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়। ফলে বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজার সম্ভাবনা বাড়ছে। বিশেষ করে কোভিডের সময়ে মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারায় এই খাতের যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে ই-কমার্স বাজারের আকার বেড়ে দাঁড়াবে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী স্থানীয় মুদ্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার মতো হবে (প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ধরে)। এটি দেশের বর্তমান ই-কমার্স বাজারের তিন গুণ হবে। বর্তমান ই-কমার্স বাজারের আকার ১০০ কোটি ডলার বা সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে দেশীয় ই-কমার্সের বাজারের এমন চিত্র উঠে এসেছে। কোভিডের সময় অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের ওপর তৈরি করা এই প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষ করে মুঠোফোনে আর্থিক সেবার (এমএফএস) ব্যবহার বাড়িয়েছে, তারাই দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে গেছে। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে বিশেষ নীতি গ্রহণের সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার মতো মহামারিকালে কিংবা হঠাৎ কোনো আঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে ছোট কারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে টিকে থাকতে পারে, সে জন্য তাদের অর্থসহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে।

জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে যে ই-কমার্সের বিশাল সম্ভাবনা আছে, তা করোনার মধ্যে প্রমাণ হয়েছে। করোনার সময়ে ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৪ সালের মধ্যে আরও ৩ লাখ কর্মসংস্থান হবে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা বাড়ছে। ফেসবুকেও উদ্যোক্তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ তিনি জানান, করোনার আগের চেয়ে এখন পণ্য ডেলিভারি অন্তত পাঁচ গুণ বেড়েছে। এতে প্রমাণ হয়, এই খাতে ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বেশ বেড়েছে।

করোনার সময় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৪ সালের মধ্যে আরও ৩ লাখ কর্মসংস্থান হবে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা বাড়ছে। ফেসবুকেও উদ্যোক্তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
—আবদুল ওয়াহেদ, সাধারণ সম্পাদক, ই-ক্যাব।

এবার দেখা যাক, করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কতটা উপকৃত হয়েছে। এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা (এমএফএস) নিয়েছে। এমএফএস নেওয়া ৭৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের লেনদেন বেড়েছে। আর সার্বিকভাবে ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বেড়েছে। ডিজিটাল লেনদেন বা এমএফএস ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার গতিও অন্য সাধারণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি হয়েছে।

এ জন্য এডিবি চার ধাপে সমীক্ষা করেছে। সর্বশেষ ধাপে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চে ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কাজে লেগেছে, তা নিয়ে সমীক্ষা করা হয়। সম্প্রতি চার ধাপের সমীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে এডিবি।

এডিবি চারটি ধাপে এই সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। করোনার শুরুর বছর ২০২০ সালের মার্চ-মে, জুন-সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর-ডিসেম্বর এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি-মার্চে সমীক্ষা করা হয়। এতে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কতটা কাজে লেগেছে, তা দেখা হয়।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের মার্চ-মে সময়ে করোনার আগের বেচাকেনার মাত্র ৪২ শতাংশ পুনরুদ্ধার হয়েছিল। এই হার ২০২১ সালের জানুয়ারি-মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭ শতাংশ। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান এমএফএস সেবা নিয়েছে, তাদের পুনরুদ্ধার আরও প্রায় ১০ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ ৮৬ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও মুনাফা দুটোই তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে।

এডিবির প্রতিবেদনে বিভিন্ন গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের ই-কমার্সের বাজার সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে আড়াই হাজার ই-কমার্স সাইট আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে ফেসবুক এখন অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়ের অপরিহার্য প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশে ফেসবুকে প্রায় ৫০ হাজার বিজনেস পেজ আছে, যা ৩ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর মাঝে ‘বুস্ট’ করে থাকে।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) হিসাবে, বিশেষ করে ২০২০ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে বিপ্লব ঘটে গেছে। ওই সময়ে অনলাইনে বেচাকেনা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেড়েছে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন