সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে কর্মসংস্থান তৈরি ও সামাজিক নিরাপত্তা খুবই জরুরি। কর দিলে নাগরিকেরা কী ধরনের সুবিধা পাবেন, সেটিও করদাতাদের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। সেই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর আদায়ব্যবস্থা সহজ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে গ্রামীণ ও নগর অবকাঠামোতে বিনিয়োগ প্রয়োজন।
আজ বুধবার ‘নির্বাচন–পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের রাজস্ব চ্যালেঞ্জ ও সমাধান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার বক্তারা এ কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভয়েস ফর রিফর্ম ও ব্রেন।
কর দেওয়ার পর একজন নাগরিক কী ধরনের সুবিধা পাবেন, বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। মানুষ যদি নিশ্চিত হয় যে কর দিলে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, তাহলে কর দিতে আগ্রহ বাড়ে
সভায় সভাপতিত্ব করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সংগঠক ও বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাসরুর। সভায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাসরুর রিয়াজ, ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের চেয়ারম্যান মাসুদ খান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার স্নেহাশীষ বড়ুয়া ও ব্রেনের নির্বাহী পরিচালক শফিকুর রহমান।
সভায় বক্তারা বলেন, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের রাজস্ব খাতে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে আগে নাগরিকদের মধ্যে কর পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সরকারি ব্যয়েরও গুণগত মান বাড়াতে হবে। মানুষের আর্থিক সক্ষমতা না বাড়লে আয় বাড়বে না। আর আয় না বাড়লে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব না। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে শ্রমঘন খাতে বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পুনর্জাগরণ ও গ্রামীণ অবকাঠামোতে বেশি বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সম্পত্তি ও সম্পদের ওপর কর আরোপ করা যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে মাসরুর রিয়াজ বলেন, যেকোনো দেশে বিদেশি ঋণ থাকে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে সমস্যা হলো ঋণের হার অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া। ২০১৭-১৮ সালের পর থেকে দেশে বিদেশি ঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চে এসে আগের বছরের তুলনায় বিদেশি ঋণের সুদ ২৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিদেশি ঋণের সুদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৬ শতাংশ। এটা সত্যিই উদ্বেগজনক।
সভায় মাসুদ খান বলেন, কর দেওয়ার পর একজন নাগরিক কী ধরনের সুবিধা পাবেন—বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। মানুষ যদি নিশ্চিত হয় যে কর দিলে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, তাহলে কর দিতে আগ্রহ বাড়ে। এ ছাড়া অনলাইনে কর রিটার্ন জমার প্রক্রিয়া এতটাই জটিল এবং এত বেশি তথ্য দিতে হয় যে অনেকের কাছে এটি কঠিন একটি প্রক্রিয়া।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে শুল্ক–কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সব দিক থেকেই অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য উন্নত দেশের মতো সরাসরি কর অর্ধেক ও পরোক্ষ কর বাকি অর্ধেক করতে হবে। কাস্টমস ও ভ্যাটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আয়কর আদায়ে বেশি মনোযোগী হতে হবে।
সভায় মূল প্রবন্ধে জ্যোতি রহমান বলেন, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় পরবর্তী সরকারকে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি করনীতি সংস্কার রোডম্যাপ বা পথনকশা তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া করনীতি সংস্কারের জন্য তৈরি করতে হবে রাজনৈতিক সহমত। পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে সরকারি সব কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। তাতে অপচয় ও পরিচালন ব্যয় কমানো যাবে।