এলপিজি সিলিন্ডারে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি, নাকচ করে দিল এনবিআর
একই প্রতিষ্ঠানের এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস ভর্তির জন্য বোটলিং ইউনিটে নিয়ে গেলে ১০ শতাংশ হারে মূসক দিতে হয়। এটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব নাকচ করা হয়েছে।
আজ বুধবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে এনবিআরের প্রাক্-বাজেট আলোচনায় লোয়াবসহ ১৩টি ব্যবসায়ী সংগঠন তাদের বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দাবি জানায়। এর মধ্যে সকালে ৪টি ও বিকেলে ৯টি সংগঠন আলোচনায় অংশ নেয়। তাদের বেশ কিছু প্রস্তাব বিবেচনার আশ্বাস দেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
লোয়াবের মহাসচিব মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বলেন, ‘আলাদা স্থানে গ্যাস ভর্তি করা হলেও একই কোম্পানি সিলিন্ডার তৈরি করে থাকে। তাই এ ক্ষেত্রে মূসক প্রত্যাহারের দাবি করছি।’ একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও জাহাজভাড়া বাড়ায় সিলিন্ডার তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব দেন।
জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘এটা কমালে দাম কমবে, এমন কোনো ব্যাপার নেই। তাই সব পর্যায়ে আমরা ভ্যাট দিয়ে দেব।’
বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্পমালিক সমিতির চেয়ারম্যান সেলিম এইচ রহমান আসবাবের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের দাবি জানান। বলেন, ‘আমাদের ২০ শতাংশ শুল্ক এবং ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক দিতে হয়। মূসক, আগাম আয়করসহ মোট করের হার দাঁড়ায় ১১৮ শতাংশ।’ অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তিনি।
এর জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনাদের জন্য যেটা কাঁচামাল, অন্যদের জন্য সেটা হয়তো প্রস্তুত পণ্য। তাই আমদানি শুল্ক এত বেশি। নয়তো এত বেশি হওয়ার কথা নয়।’
বাংলাদেশ পেপার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করার দাবি জানায়। সংগঠনটির পরিচালক মো. বেলাল বলেন, ‘এখানে যেসব পেপার তৈরি হয় না, তা আমরা আমদানি করে থাকি।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন শুল্ক বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন উৎসে কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে। সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. তারিকুল ইসলাম জহির বলেন, ‘আমরা চাষিদের কাছ থেকে চিংড়ি সংগ্রহ করি। তাঁদের না আছে ব্যাংক হিসাব, না আছে ভ্যাট নিবন্ধন।’ ভেনামি চিংড়ি আমদানি করে রপ্তানিরও অনুমতি চান তিনি।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের দাবি জানায়। সংগঠনটির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘সেবা খাত বলে আমাদের যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। এটা ১ শতাংশ করা হোক।’ তিনি মাঠ থেকে আলু ক্রয়ে উৎসে কর প্রত্যাহারের দাবি জানান।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি শুল্কায়নে অতিরিক্ত দর বিবেচনা করা হয় বলে অভিযোগ করেছে। সংগঠনটির সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, চিলার আমদানিতে ১ শতাংশ শুল্ক থাকলেও চট্টগ্রাম কাস্টমস ১০৪ শতাংশ শুল্ক নেয়। উপকরণ আমদানিতে তিনি ১ শতাংশ শুল্ক–সুবিধা দিতে আলাদা এসআরও জারির দাবি জানান।
বাংলাদেশ এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল মাওলা বলেন, এই খাত এখনো আমদানিনির্ভর। তাই প্রস্তুত পণ্যে শুল্ক বাড়ানো দরকার।
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির সুপারিশ
করদাতাদের বার্ষিক করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করার সুপারিশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সীমিত আয়ের করদাতাদের খানিক স্বস্তি দিতে এ প্রস্তাব দেয় ডিসিসিআই।
ঢাকা চেম্বারের পক্ষে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন সংগঠনটির কাস্টমস ও ভ্যাটবিষয়ক স্থায়ী কমিটির আহ্বায়ক এ বি এম লুৎফুল হাদি। তিনি ননলিস্টেড কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ করার দাবি জানান এবং বাণিজ্যিক আমদানিতে আগাম করহার সাড়ে ৭ শতাংশের বদলে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন। এ সময় আরও বক্তব্য দেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমছে। তাই শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করে কর্মসংস্থান বাড়ানো যাবে না। অন্যান্য খাতকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ছোটদের ওপর শুল্কের চাপ নিয়ে আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বড় কোম্পানিগুলোকে প্লাস্টিকের কাঁচামাল আমদানিতে ১ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অগ্রিম কর, আগাম আয়কর, মূসকসহ ৩০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। এ সময় তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা করের স্তর করার প্রস্তাব দেন। উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১ কোটি টাকার ব্যবসায় বছরে ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা কর দিতে হবে—এমন স্তর করা যায়।
সভায় সিলেট চেম্বারের বাজেট কমিটির সদস্য তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এনবিআর পুরোনো মামলা সমাধান করলে অনেক টাকা আয় করতে পারবে।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের পরিচালক সোহেল আক্তার বলেন, ‘কাস্টমসের বিলম্বের জন্য আমাদের বন্দরে জরিমানা দিতে হয়।’ এ সময় তিনি ব্যবসায়ে নারীদের সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান। জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরাও এটা নিয়ে কাজ করতে চাই। তবে সুবিধা কার্যকর করতে আমাদের তথ্য লাগবে।’