বাজেট কী, বাজেট কীভাবে বুঝব

আমরা প্রতি মাসে আয় করি, খরচ করি, কখনো সঞ্চয় করি, আবার কখনো ধারও করতে হয়। সংসার চালাতে মাসের শুরুতে পরিকল্পনা করি বাড়িভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের স্কুল, চিকিৎসা, একটু ঘুরতে যাওয়া আর কিছু টাকা ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া। কিন্তু মাস শেষে এসে দেখা যায়, হিসাব ঠিক মিলছে না।

বাংলাদেশ সরকারও ঠিক একই কাজ করে। পার্থক্য শুধু একটাই, আমার-আপনার সংসারে চার-পাঁচজন মানুষ, আর সরকারের সংসারে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ।
এই বিশাল সংসার চালানোর বার্ষিক পরিকল্পনার নামই জাতীয় বাজেট।

বাজেট কথাটা শুনলেই অনেকে ভয় পান। মনে হয়, এটি কেবল অর্থমন্ত্রী, আমলা আর অর্থনীতিবিদদের বিষয়। কিন্তু বাস্তবে বাজেট সকালের নাশতা থেকে রাতের ওষুধ পর্যন্ত সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। আপনি যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, ইন্টারনেট চালান, লুকিয়ে সিগারেট খান, গাড়ি চড়েন, চাল-ডাল কেনেন—সবকিছুর পেছনেই আছে বাজেট।

বাজেট কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রারই গল্প।

বাজেট এল কীভাবে

রবার্ট ওয়ালপুল

বাজেট কথাটা এসেছে ফরাসি শব্দ বুজেট থেকে। এর অর্থ চামড়ার তৈরি টাকার থলে। এই বাজেটও আমাদের উপহার দিয়েছিল ব্রিটিশরা। ১৭৩৩ সালে দেশটির রাজা ছিলেন দ্বিতীয় জর্জ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন রবার্ট ওয়ালপুল। তখন আবগারি শুল্ক বসত কেবল মদ ও তামাকের ওপর। এই শুল্ক বাড়াতে বা কমাতে যত দাবি বা প্রস্তাব তিনি পেতেন, সব একটা ব্যাগে রেখে দিতেন। পরে সেই ব্যাগ থেকে কাগজপত্র বের করে পার্লামেন্টে আর্থিক প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। এই হচ্ছে বাজেটের শুরু।

উপমহাদেশের প্রথম ও শেষ বাজেট

জেমস উইলসন

উপমহাদেশের প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন জেমস উইলসন। রানির প্রতিনিধি হিসেবে ভারতে এসেছিলেন ১৮৫৯ সালে। সিপাহি বিদ্রোহের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বের অবসান হয়ে গেছে। সরাসরি ব্রিটিশদের শাসন শুরু। সিপাহি বিদ্রোহের অবসানের তিন বছর পর দেওয়া হয়েছিল সেই বাজেট। জেমস উইলসন ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল উপমহাদেশের প্রথম বাজেটটি পেশ করেছিলেন। স্কটিশ এই ব্যবসায়ী ছিলেন ইন্ডিয়া কাউন্সিলের ফিন্যান্স মেম্বার। তাঁর অবশ্য আরও পরিচয় আছে। তিনি ছিলেন চার্টার্ড ব্যাংক ও বিখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা। পরে চার্টার্ড ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হলে নামকরণ হয় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।

লিয়াকত আলী খান

ব্রিটিশ ভারতের শেষ বাজেট দিয়েছিলেন লিয়াকত আলী খান। উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, তাতে যোগ দিয়েছে মুসলিম লীগ। লিয়াকত আলী খান তখন হলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন ১৯৪৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। লিয়াকত আলী খানের সেই বাজেট ‘পুওর ম্যান বাজেট’ বা গরিবদের বাজেট বলা হয়। সেই বাজেটে লবণের ওপর কর সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়া হয়েছিল। ব্যক্তিশ্রেণির ন্যূনতম আয়করের সীমা দুই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে আড়াই হাজার টাকা করা হয়। যাঁদের আয় এক লাখ টাকার বেশি, তাঁদের ওপর ২৫ শতাংশ হারে বিশেষ আয়কর আরোপ করাও হয় সেই বাজেটে।

মালিক গুলাম মোহাম্মদ

দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে ১৯৪৮-৪৯ অর্থবছরের প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন মালিক গুলাম মোহাম্মদ। এই পাকিস্তান আমলেই মুসলিম লীগ সরকারের সময় অর্থবছর গণনা এপ্রিল-মার্চ থেকে সরে এসে জুলাই-জুন করা হয়। সেই ধারা বাংলাদেশে রয়ে গেছে। তবে ভারত এখনো এপ্রিল-মার্চ ধরে অর্থবছর বিবেচনা করে। স্বাধীন ভারতে প্রথম বাজেট দেন অর্থমন্ত্রী আর কে শানমুখম শেট্টি, ১৯৪৭ সালের ২৬ নভেম্বর।
বাংলাদেশের প্রথম অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন ১৯৭২ সালের ৩০ জুন। রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একই সঙ্গে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন।

বাজেট নিয়ে কিছু আইনি কথাবার্তা

স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই বলেছিলেন, ‘বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে এই বাজেট প্রচার না করে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করতে পারলে আমি সুখী হতাম। তবে আমি আশা করি যে এর পরে আর কোনো দিন এইভাবে আমাদের বাজেট প্রচার করতে হবে না।’

বাজেট পেশের আগে তাজউদ্দীন আহমদ

প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের সামনে বাজেট উপস্থাপন এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন?
রাষ্ট্র জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করবে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু এই কর আরোপের ক্ষমতা কারও একক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না। তা হতে হবে জনগণের প্রতিনিধিদের সম্মতির ভিত্তিতে।

আধুনিক গণতান্ত্রিক বাজেটব্যবস্থার এই যে মৌলিক ধারণা, তার শিকড় ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা-তে। লাতিন ভাষার ম্যাগনা কার্টার অর্থ ‘মহাসনদ’ বা ‘গ্রেট চার্টার’। এই ম্যাগনা কার্টা ছিল ইংল্যান্ডের রাজা জনের ক্ষমতা সীমিত করার একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। তখন রাজা জন কর বাড়িয়ে ব্যারন বা অভিজাত ভূস্বামীদের ওপর চাপ দিচ্ছিলেন ও নিজের ইচ্ছেমতো শাসন করছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ ব্যারনরা বিদ্রোহ করেন। পরে রাজা বাধ্য হয়ে ম্যাগনা কার্টায় সই করেন।

ম্যাগনা কার্টার ১২ নম্বর ধারায় বলা আছে, রাজা রাজ্যের প্রতিনিধিদের পরামর্শ ও সম্মতি ছাড়া কোনো কর আরোপ করতে পারবেন না। এই ধারণাই পরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে রূপ নেয়। অর্থাৎ ‘নো ট্যাক্সেশন উইদাউট রিপ্রেজেন্টেশন’। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়’। অর্থাৎ যে জনগণ কর দেবে, তাদের প্রতিনিধিদের সম্মতি ছাড়া সেই কর আরোপ করা যাবে না।

ম্যাগনা কার্টায় সই করছেন রাজা জন

এই কথা পরে স্লোগানে পরিণত হয় ১৭৬৫ থেকে ১৭৮৩ সালের মার্কিন বা আমেরিকান বিপ্লবের সময়ে। তখন আমেরিকার ১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশ ব্রিটেনের অধীনে ছিল। সংকট শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার উপনিবেশগুলোর ওপর নানা ধরনের কর আরোপ করলে। তখনই এর বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছিল যে ‘নো ট্যাক্সেশন উইদাউট রিপ্রেজেন্টেশন’। অর্থাৎ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যদি তাদের কোনো প্রতিনিধি না থাকে, তাহলে সেই পার্লামেন্ট তাদের ওপর কর চাপাতে পারে না। তখন এই স্লোগান পরিণত হয় রাজনৈতিক অধিকারের আন্দোলনে। এরপর ১৭৭৩ সালে বোস্টন টি পার্টিতে উপনিবেশবাসীরা ব্রিটিশ করনীতির প্রতিবাদে চায়ের চালান সমুদ্রে ফেলে দেয়। এরপর ব্রিটেন কঠোর ব্যবস্থা নেয়। উত্তেজনা বাড়তে বাড়তে ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বিপ্লবী যুদ্ধ শুরু হয়। ১৭৭৬ সালে উপনিবেশগুলো স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

এখন সব দেশই এটা মেনে চলে। আমরাও এটা অনুসরণ করি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংসদের কোন আইনের দ্বারা বা কর্তৃত্ব ব্যতীত কোন কর আরোপ বা সংগ্রহ করা যাইবে না।’

আবার সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রতি অর্থবছরে সরকারকে সংসদের সামনে সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের বিবরণী উপস্থাপন করতে হয়।

একেই বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি বলা হয়। এরপর সংসদে আলোচনা, অনুদান দাবি, বরাদ্দ অনুমোদন এবং অর্থবিল পাসের মাধ্যমে সরকার কর আদায় ও অর্থ ব্যয়ের অনুমতি পায়। এটাই বাজেট।

আবার ধরুন, একটি পরিবার সিদ্ধান্ত নিল যে তাদের সন্তানকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে। এতে খরচ বাড়বে ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যতে সন্তানের আয় বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। সরকারও একইভাবে কিছু খরচ করে ভবিষ্যতের অর্থনীতি বড় করতে চায়। এটাই আছে উন্নয়ন বাজেট।

টাকা কোথা থেকে আসে

এখন বর্তমান সময়ে ফিরে আসি। অর্থমন্ত্রী নতুন যে বাজেটটি দেবেন, তার আকার হবে সোয়া নয় লাখ কোটি টাকার বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই টাকা আসবে কোথা থেকে?
সরকারের তো নিজের আয় নেই। আসলে সরকারকে এই অর্থ আমরাই দিই, আমাদের পকেট থেকে।

আমরা কেন দিই? কারণ, আমরা চাই সরকার এই অর্থ দিয়ে এমন ব্যবস্থা করবে, যাতে আমরা আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারি, আমাদের ভালো বাসা থাকে, আমাদের সন্তানেরা ভালো শিক্ষা পায়, শিক্ষা শেষে ভালো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়, আর আমরা যেন ভালো চিকিৎসা পাই। অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা। এই মৌলিক চাহিদার কথা সংবিধানেই লেখা আছে।

এ জন্য এই যে অর্থ দিই, এর নাম ট্যাক্স বা কর।

ধরুন আপনি একটি সাবান কিনলেন। সেখানে ভ্যাট কাটা হলো। আপনি মোবাইলে রিচার্জ করলেন, সেখানেও কর কাটা হলো। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেন, তাতেও ভ্যাট দিলেন। চাকরি করলে আয়করও দিতে হয়।

অর্থাৎ আপনি বুঝুন আর না-ই বুঝুন, প্রায় প্রতিদিনই সরকারকে টাকা দিচ্ছেন।
রাষ্ট্রের আয়ের কতকগুলো উৎস আছে। এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর ও করবহির্ভূত আয়। প্রত্যক্ষ করের মধ্যে আছে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর কর (করপোরেট কর), দান কর, উত্তরাধিকার কর, যানবাহন কর, মাদক শুল্ক, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি। আর পরোক্ষ কর হচ্ছে আমদানি কর, আবগারি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), সম্পূরক শুল্ক—এ রকম নানা ধরনের কর।

কর ছাড়া আরও আয় আছে। যেমন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ, সুদ, সাধারণ প্রশাসন থেকে আয়; ডাক, তার ও টেলিফোন থেকে আয়; পরিবহন আয়, জরিমানা ও দণ্ড থেকে আয়; ভাড়া, ইজারা, টোল ও লেভি থেকে আয় ইত্যাদি।

রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট

সরকার এই টাকা দিয়ে কী করে? সরকার দুভাবে এই অর্থ ব্যয় করে।
একটি হচ্ছে রাজস্ব ব্যয়, যা সরকার পরিচালনার খরচ। একে অনুন্নয়ন বাজেটও বলা হয়। এই ব্যয় মোটাদাগে তিনটি। যেমন দেশ রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসন চালানোর খরচ।

আবার ধরুন, একটি পরিবার সিদ্ধান্ত নিল যে তাদের সন্তানকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে। এতে খরচ বাড়বে ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যতে সন্তানের আয় বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। সরকারও একইভাবে কিছু খরচ করে ভবিষ্যতের অর্থনীতি বড় করতে চায়। এটাই আছে উন্নয়ন বাজেট।

এ জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নামে একটি প্রকল্প খাত রয়েছে। এই খাতেই সাধারণত উন্নয়ন বাজেটের খরচ দেখানো হয়। রাস্তা বা সেতু নির্মাণ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করে সরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজেট ঘাটতি

সমস্যা হলো আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সরকারের আয় যত, খরচ তার চেয়ে বেশি। একেই বলা হয় বাজেট ঘাটতি।

এখানে সরকার আর আপনার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য আছে। আপনি আগে আয় করেন, তারপর খরচ করেন। সরকার আগে খরচ ঠিক করে, তারপর আয়ের ব্যবস্থা করে।

সরকার বছরে ১০০ টাকা আয় করলেও খরচ করতে চায় ১৩০ টাকা। বাকি ৩০ টাকা কোথা থেকে আসবে? সহজ উত্তর—ঋণ।

সরকার মূলত দুভাবে ঋণ নেয়।

সরকারের ঋণের দুই উৎস

ক. বৈদেশিক উৎস

সরকার বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশ থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়। এই উৎস থেকে বেশি ঋণ নিতে পারলে তা অর্থনীতির জন্য বেশি সহনীয়। কারণ, এতে সুদহার কম এবং পরিশোধ করতে অনেক সময় পাওয়া যায়। তবে শর্ত থাকে বেশি। আর এখন পাওয়াও যাচ্ছে কম। তাই দেশের ভেতর থেকেই বেশি ঋণ নিতে হয়।

খ. অভ্যন্তরীণ উৎস

সরকার দুভাবে দেশের ভেতর থেকে ঋণ নেয়। যেমন ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা। ব্যাংক ব্যবস্থার উৎসগুলো হচ্ছে ট্রেজারি বিল, বন্ড বিক্রি, ইত্যাদি। ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থার মধ্যে আছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঋণ নেয় সরকার।

আসল বিপদ এখানেই

বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অংশ এটি। কারণ, এখানেই অর্থনীতির অনেক বিপদ লুকিয়ে থাকে।

ধরুন, আপনার আয় কম হলে আপনিও ধার করে খরচ চালাতে পারেন। প্রথম বছর সমস্যা হলো না। দ্বিতীয় বছরও না। কিন্তু বছরের পর বছর বাড়তে থাকলে একসময় ঋণের আসল ও সুদ দেওয়াই বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে।

বছরের পর বছর জমতে থাকা এই ঋণই জাতীয় ঋণ।

ঋণ খারাপ কিছু নয়। সব দেশই ঋণ নেয়। সমস্যা তখনই, যখন ঋণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন শ্রীলঙ্কা বা আর্জেন্টিনার মতো সংকট তৈরি হয়। দেশ দেউলিয়া হয়।
এ কারণেই বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, সরকার কত ঋণ নিচ্ছে, কোথা থেকে নিচ্ছে আর সেই ঋণ কোথায় ব্যয় করছে।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার দুটি বড় ঝুঁকি আছে। প্রথমত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারই বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণযোগ্য অর্থ কমে যায়। এতে বিনিয়োগ কমবে।

আবার সরকার যদি সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেশি সুদ দিতে হয়। এতে সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ে। এ কারণেই প্রায়ই সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর জন্য আইএমএফ চাপ দেয়।

সরকার কি চাইলেই টাকা ছাপাতে পারে

সরকারের ঋণ নেওয়ার আরেকটি উৎস আছে। যেমন: সরকার চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন টাকা সৃষ্টি করে বাজেট ঘাটতি মেটাতে পারে। সাধারণ ভাষায় একে বলা হয় টাকা ছাপানো। অর্থাৎ সব সময় যে প্রিন্টিং প্রেস থেকে টাকা ছাপতে হয়, তা কিন্তু নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত সরকারকে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে নতুন টাকা সৃষ্টি করে।

সহজভাবে প্রক্রিয়াটি এমন:

টাকা দরকার হলে সরকার ট্রেজারি বিল বা বন্ড ছাড়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেগুলো কিনে নেয়। বিনিময়ে সরকারের হিসাবে টাকা জমা করে। সরকার সেই টাকা খরচ করলে বাজারে নতুন টাকা ঢোকে। এটাকেই অনেক সময় সহজ ভাষায় টাকা ছাপানো বলা হয়।

সুতরাং বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটালভাবে সরকারের হিসাবে টাকা যোগ করে। পরে প্রয়োজন হলে সেই টাকার অংশ নগদ নোট হিসেবেও বাজারে আসে।

তাহলে বলতে পারেন, এত ঝামেলার দরকার কী। সরকার তো এভাবে টাকা ছাপিয়েই বাজেট তৈরি করতে পারে।

সমস্যা হচ্ছে টাকা ছাপালেই তো সম্পদ তৈরি হয় না। সম্পদ আসে উৎপাদন, পণ্য, সেবা, কর্মসংস্থান ও আস্থার মাধ্যমে। তাই সরকার যদি কর আদায় বা ঋণ নেওয়ার বদলে শুধু টাকা ছাপিয়ে বাজেট করে, তাহলে অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহই কেবল বাড়বে। কিন্তু চাল, তেল, বিদ্যুৎ, বাড়ি বা চাকরি একই হারে বাড়বে না। ফলে একই পণ্যের পেছনে বেশি টাকা ছুটবে, এতে দাম বাড়বে, অর্থনীতির সংকট আরও বাড়বে।
তা ছাড়া বাজেটের আসল ভিত্তি টাকা ছাপানো নয়। বরং উৎপাদনশীল অর্থনীতি ও মানুষের আস্থা।

অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে কিছুটা ঘাটতি থাকা ভালো। এতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে। তাতে অর্থনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। ঘাটতি বেশি থাকাটা আবার ভালো নয়। সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতিকে মেনে নেওয়া হয়।

কোন বাজেট ভালো

আয় ও ব্যয়ের দিক থেকে বাজেট দুই রকমের। যেমন:

ক. সুষম বাজেট

সরকারের মোট আয় ও মোট ব্যয় সমান হলে সেটি হচ্ছে সুষম বাজেট। অর্থাৎ সরকারের মোট ব্যয় পরিকল্পনার সমানই হচ্ছে সম্ভাব্য আয়।

খ. অসম বাজেট

যেখানে আয় আর ব্যয় সমান হয় না। অসম বাজেট আবার দুই রকমের হতে পারে। যেমন উদ্বৃত্ত বাজেট ও ঘাটতি বাজেট। ব্যয়ের তুলনায় আয় বেশি হলে সেটি উদ্বৃত্ত বাজেট। ঘাটতি বাজেট হচ্ছে ঠিক উল্টোটা। এখানে ব্যয় বেশি, আয় কম।

প্রশ্ন হচ্ছে, কোন বাজেটটি ভালো।

সাধারণত উন্নত দেশগুলো সুষম বাজেট করে থাকে। তবে প্রতিবছরই সুষম বাজেট করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। উন্নত বা ধনী দেশগুলো বাণিজ্যচক্র মেনে সুষম বাজেট করে। অর্থাৎ অর্থনীতির ওঠানামার সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরের বাজেট তৈরি করা হয়। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো হলে সুষম বাজেট, খারাপ হলে ঘাটতি বাজেট। অনেক উন্নত দেশই আইন করে সুষম বাজেট তৈরি করে।

অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, অব্যাহতভাবে সুষম বাজেট তৈরি করা ভালো কিছু নয়, বরং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বাজেট কেমন হবে ঠিক করা উচিত। কেননা, সুষম বাজেট সুদের হার কমায়, বাড়ায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ। এ ছাড়া বাণিজ্যঘাটতি কমিয়ে আনে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি এগিয়ে যায়।

সাধারণত অর্থনীতি ভালো অবস্থায় থাকলে সুষম বাজেট করা হয়, খারাপ হলে অর্থনীতিকে উদ্দীপনা দিতে তৈরি হয় ঘাটতি বাজেট। একটা সময় ছিল যখন ঘাটতি বাজেটকে ক্ষতিকর ও সরকারের দুর্বলতাও ভাবা হতো। পরিস্থিতি এখন পাল্টেছে, বরং অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে কিছুটা ঘাটতি থাকা ভালো। এতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে। তাতে অর্থনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। ঘাটতি বেশি থাকাটা আবার ভালো নয়। সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতিকে মেনে নেওয়া হয়।

কোন দেশের কী নীতি

জার্মানির সংবিধানে ‘ডেট ব্রেক’ বা ঋণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার খুব সীমিত পরিমাণে ঘাটতি করতে পারে। ফলে সরকার যখন অর্থনীতি ভালো থাকে, তখন ঋণ কম নেয় এবং ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখে।

সুইজারল্যান্ডেও একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে অর্থনীতি খারাপ থাকলে সরকার ঘাটতি করতে পারে। কিন্তু অর্থনীতি ভালো হলে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে উদ্বৃত্ত বা কম ঘাটতির বাজেট করতে হয়। অর্থাৎ পুরো অর্থনৈতিক চক্র বিবেচনায় আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।

সুইডেনও দীর্ঘদিন ধরে একটি আর্থিক শৃঙ্খলা অনুসরণ করে আসছে। দেশটি অর্থনীতি ভালো থাকলে কিছুটা উদ্বৃত্ত রাখার চেষ্টা করে, যাতে ভবিষ্যতে মন্দা দেখা দিলে অতিরিক্ত ব্যয় করার সুযোগ থাকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে সাধারণভাবে সদস্যদেশগুলোর বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি এবং সরকারি ঋণ জিডিপির ৬০ শতাংশের বেশি না রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও বাস্তবে সব দেশ সব সময় এই সীমা মেনে চলতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার নিয়মিত ঘাটতি বাজেট করে। তবে দেশটির অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব সংবিধান বা আইনে সুষম বাজেটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে তারা সাধারণত আয় যত, ব্যয়ও তত রাখার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাজেট আইন নেই। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় সব বাজেটই ঘাটতি বাজেট। কারণ, বাংলাদেশ এখনো একটি উন্নয়নশীল দেশ। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। ফলে সরকারের ব্যয় সাধারণত আয়ের চেয়ে বেশি থাকে।

এককথায়, সুষম বাজেট সব সময় ভালো এবং ঘাটতি বাজেট সব সময় খারাপ—এমন নয়। অর্থনীতির অবস্থা, উন্নয়নের প্রয়োজন এবং ঋণের ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করে কোন ধরনের বাজেট একটি দেশের জন্য উপযুক্ত হবে।

সরকার আসলে কী করতে চায়

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে বাজেটের মাধ্যমে সরকার আসলে কী করতে চায়। কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব করাই তো একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। একটা ভালো সরকারের কাজ হচ্ছে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া, প্রবৃদ্ধি টেকসই করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, দারিদ্র্য বিমোচন, ইত্যাদি। আরে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব নীতি।

আমরা দুটি নীতির কথা জানি। যেমন: ফিসকাল বা রাজস্বনীতি এবং মনিটারি বা মুদ্রানীতি। রাজস্ব নীতি বাজেটের অংশ, আর মুদ্রানীতির দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার, নগদ জমার বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি সিকিউরিটিজ ও বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। আর তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলে। এটাই মুদ্রানীতি।

অন্যদিকে সরকার করের পরিমাণ ও ধরন, ব্যয়ের আকার ও গঠন, এবং ঋণ নেওয়ার ধরন ও পরিমাণ বদলে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। যাকে আমরা বলি রাজস্ব নীতি।

রাজস্বনীতি যেভাবে কাজ করে

সরকার রাজস্ব নীতির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে সম্পদের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে। জাতীয় আয় হিসাবের একটি মৌলিক সমীকরণ দিয়ে এটি বোঝানো যায়। যেমন:

GDP=C+I+G+NX

এখানে জিডিপি হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদন। অর্থাৎ এক বছরে দেশে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট বাজারমূল্য।

সি হচ্ছে কনজাম্পশন বা মানুষের ভোগব্যয়। যেমন: মানুষ খাবার ও পোশাক কেনে, ভাড়া দেয়, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহনে ব্যয় করে।

আই হলো ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগ। যেমন: কারখানা, যন্ত্রপাতি, ভবন, ব্যবসার মজুত পণ্য, ইত্যাদি।
জি হচ্ছে সরকারি ব্যয়। যেমন: রাস্তা, সেতু, বেতন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা।

এনএক্স হচ্ছে নিট রপ্তানি। অর্থাৎ রপ্তানি আয় থেকে আমদানি ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে।
সহজভাবে বলা যায়, একটি অর্থনীতিতে মোট উৎপাদিত জিনিস শেষ পর্যন্ত কে কিনল—এই হিসাবই জিডিপি বা মোট আয়।

এই সমীকরণে সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে জি, অর্থাৎ সরকারি ব্যয়। যেমন: সরকার রাস্তা, সেতু, স্কুল, হাসপাতাল বানালে বা বেতন-ভাতা দিলে অর্থনীতিতে সরাসরি চাহিদা তৈরি হয়।

কিন্তু সরকার শুধু নিজের ব্যয়ের মাধ্যমে পুরো জিডিপিকে প্রভাবিত করতে পারে না। তাই পরোক্ষ পদক্ষেপ নেয়। যেমন: কর কমালে মানুষের হাতে বেশি টাকা থাকে। ফলে সি বা ভোগব্যয় বাড়তে পারে। আবার করছাড়, ভর্তুকি বা সহজে ঋণ দিলে আই বা বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এ ছাড়া রপ্তানি প্রণোদনা ও শুল্কনীতির মাধ্যমে এনএক্স, অর্থাৎ নিট রপ্তানিও প্রভাবিত হতে পারে। বাজেটে সরকার মূলত এটাই করে।
সুতরাং বাজেট শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের খাতা নয়; এটি অর্থনীতির গতি বাড়ানো, কমানো বা দিক পরিবর্তনের একটি মাধ্যম।

বাজেট কখন ভালো, কখন খারাপ

তাহলে আমরা বাজেট ভালো না খারাপ কীভাবে বুঝব?

প্রথমেই দেখতে হবে সরকার কোথায় অর্থ ব্যয় করছে। যদি বাজেটের বড় অংশ বেতন-ভাতা ও ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায়, তাহলে বুঝতে হবে পরিচালন ব্যয় বেশি, উন্নয়ন ও জনসেবার জন্য সুযোগ কম।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আপনার করের টাকায় যে সরকারি ব্যয় হচ্ছে, তার বিনিময়ে আপনি কতটা সেবা পাচ্ছেন। বেতন-ভাতার বরাদ্দ বাড়লে সেটি প্রশাসনিক দক্ষতা, সেবার মান বা জবাবদিহি বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

আবার উন্নয়ন ব্যয়ের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাস্তাঘাট, হাটবাজার বা দৃশ্যমান অবকাঠামো প্রকল্পে বেশি অর্থ বরাদ্দ হয়, কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে, তাহলে সরকারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি ব্যয় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রতি গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়।

বাজেটের কী কী দেখবেন

বাজেট তো দেশের মানুষের জন্য। তাহলে বাজেটের কোন কোন দিকে নজর রাখবে দেশের মানুষ।

১. মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর নতুন কর, শুল্ক বা ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে কি না, তা দেখা জরুরি। কারণ, এসব সিদ্ধান্ত সরাসরি বাজারদরে প্রভাব ফেলে। গত প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে থাকা মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এবারের বাজেট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা সহায়ক হবে।

২. করনীতি ও করের বোঝা
কারা বেশি কর দেবেন, কারা কর-সুবিধা পাবেন এবং করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ছে নাকি কমছে—এসব বিষয় বেতনভোগী ও মধ্যবিত্তদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

৩. কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ
বাজেটে স্থানীয় শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, অবকাঠামো এবং রপ্তানি খাতে নতুন কী থাকছে, তা–ও দেখতে হবে। কারণ, এসব খাতের বিনিয়োগই নতুন চাকরি সৃষ্টি করে।

৪. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য কত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে এবং আগের বছরের তুলনায় তা বাড়ছে নাকি কমছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

৫. সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্যসহায়তা বা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ছে কি না, তা নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য খুবই দরকারি।

৬. উন্নয়ন প্রকল্প ও অবকাঠামো
নিজ এলাকার রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি বা অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন প্রকল্প বা বরাদ্দ আছে কি না, তা–ও দেখার বিষয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এসব প্রকল্প সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নেওয়া হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের সুবিধার জন্য।

৭. ঋণ ও বাজেট ঘাটতি
সরকার কী পরিমাণ ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ করবে এবং সেই ঋণের উৎস কী, তা জানাটা জরুরি। এ তথ্য ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চাপ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
সুতরাং শেষ কথা হচ্ছে, বাজেট শুধু অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতা নয়, এটি আসলে সবার গল্প।