দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে চাই রাজনৈতিক ঐকমত্য

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ১৯০ কোটি মানুষের বসবাস। অথচ এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই কম। এসব দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। তাঁদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাব আছে। এই দেশগুলোর রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় উপার্জনকারীদের অধিকাংশই আবার অদক্ষ। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের মধ্যকার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক বাধার পাশাপাশি অ–শুল্ক বাধাও আছে। এমন বাস্তবতায় এই অঞ্চলের দেশগুলোকে ওপরের দিকে নিতে হলে দরকার রাজনৈতিক ঐকমত্য। পাশাপাশি সব সময় তদারকির জন্য দরকার আলাদা একটা শক্তিশালী দপ্তর।

‘নতুন পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ও বৈশ্বিক মাত্রায় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী এক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। এটি ১৪তম দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক সম্মেলন (এসএইএস)। ঢাকার একটি হোটেলে আজ শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আয়োজনে এ সম্মেলন শুরু হয়। সিপিডির প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সংস্থাটির ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের একটি হলো এ সম্মেলন।

সম্মেলনের সহ–আয়োজক হয়েছে ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ অব শ্রীলঙ্কা (আইপিএস), ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টার ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজ (আরআইএস), নেপালের সাউথ এশিয়া ওয়াচ অন ট্রেড, ইকোনমিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (এসএডব্লিউটিইই) এবং পাকিস্তানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউট (এসডিপিআই)।

সিপিডির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রধান অতিথি ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

নির্ধারিত আলোচক ছিলেন শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পি নন্দলাল বীরসংহ, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ইশরাত হোসেন এবং নেপালের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও গভর্নর যুবরাজ খাতিওয়াদা। এ ছাড়া সহ–আয়োজক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে চারজন কথা বলেন।

বক্তারা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনে শক্তিশালী আঞ্চলিক সংযোগ, সহযোগিতা এবং বাণিজ্যপ্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব গ্রহণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে এই অঞ্চলের দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮ শতাংশে নিয়ে আসতে পেরেছে বলে উল্লেখ করেন।

বিশেষ অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বিশ্বের মোট বাণিজ্যের মাত্র ৮ শতাংশ হয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। শুধু ঔপনিবেশিক আমল নয়, দেশগুলোর সঙ্গে হাজার বছরের সম্পর্ক বাংলাদেশের। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে নৌ, সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

এম এ মান্নান আরও বলেন, ‘অবকাঠামো উন্নয়ন করছি। আমরা ভারত, নেপাল ও ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবাধে চলাচল করতে আগ্রহী।’

সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ বাণিজ্যই হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় এবং অঞ্চল হিসেবে ‘দক্ষিণ এশিয়া’ এখনো শক্তিশালী কোনো জায়গা নয়। অথচ একে শক্তিশালী করার সুযোগ আছে। এবারের সম্মেলনের মূল আলোচনাও তা নিয়েই।

রেহমান সোবহান মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়নে একটা দপ্তর থাকা দরকার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের অবকাঠামো উন্নয়ন যতটুকু হয়েছে, তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।

আলোচনা
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পি নন্দলাল বীরসিংহ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক জাতি আছে। প্রায় ২০০ কোটি জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে। কিন্তু ‘দক্ষিণ এশিয়া পরিচয়’টা এখনো ব্যাপকভাবে পরিচিত নয়। আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ প্রবাহ, আর্থিক সংযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সার্কটাকে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে।

ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ অব শ্রীলঙ্কার (আইপিএস) নির্বাহী পরিচালক দুশনি বীরাকুন আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দেন।

সম্মেলনের সহ–আয়োজক ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টার ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজের (আরআইএস) মহাপরিচালক শচীন চতুর্বেদী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ কম। এ জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রতিশ্রুতি দরকার। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুবিধার দিক থেকে আঞ্চলিক অখণ্ডতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নেপালের সাবেক অর্থমন্ত্রী যুবরাজ খাতিওয়াদা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে মোটামুটি মিল আছে। এগুলো হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা। কিন্তু দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ খুবই কম। গভীর গবেষণার মাধ্যমে সমস্যাগুলো মোকাবিলায় ঐকমত্য দরকার।

নেপালের সাউথ এশিয়া ওয়াচ অন ট্রেড, ইকোনমিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (এসএডব্লিউটিইই) নির্বাহী পরিচালক পরেশ খারেল বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব নিয়ে অতীতে বহুবার আলোচনা হয়েছে। এখন নতুন বাস্তবতা। ফলে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ইশরাত হোসেন বলেন, অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ হয় নিজেদের মধ্যে। তাই বাণিজ্য বাড়াতে ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হওয়া দরকার। আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদারে দরকার শক্তিশালী গণতন্ত্র।

পাকিস্তানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের (এসডিপিআই) নির্বাহী পরিচালক আবিদ কাইয়ুম সুলেরি বলেন, আঞ্চলিক সংঘাত আছে। আছে জলবায়ু পরিবর্তন। এসব সমস্যা দূর হওয়া উচিত। আর এ জন্য দরকার আঞ্চলিক সহযোগিতা।