ইউরোপের সবজি ব্রকলি যেভাবে দেশে জনপ্রিয়তা পেল
একসময় শুধু ইতালি ও গ্রিসের মতো ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের দেশে চাষ হতো ব্রকলি। ইউরোপের সেই সবজির এখন বাংলাদেশেও চাষ হয়। কয়েক বছর আগেও দেশে ব্রকলি খুব বেশি জনপ্রিয় ছিল না। তবে বর্তমানে ব্রকলি বাংলাদেশের একটি উচ্চমূল্যের শীতকালীন সবজি। ভোক্তারা যেমন সবজিটি খেতে খুব পছন্দ করছেন, তেমনি কৃষকেরাও ব্রকলি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে গতকাল মঙ্গলবার সপ্তাহে প্রতিটি ব্রকলি ৪০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এই বাজারে ১০–১২টি বড় সবজির দোকান রয়েছে। প্রতিটি দোকানেই ব্রকলি বিক্রি হতে দেখা যায়। এই বাজারের সবজি বিক্রেতা আল নাহিয়ান প্রথম আলোকে বলেন, চার বছর আগে পুরো শীত মৌসুমে ৮০ থেকে ৯০টা ব্রকলি বিক্রি করতাম। এখন দৈনিক ৮০–১০০টি ব্রকলি বিক্রি হয়।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বিক্রেতা আব্বাস আকন্দ জানান, ২০২১ সালে তিনি প্রথম ব্রকলি বিক্রি শুরু করেন। সে সময় সাধারণ মানুষ ব্রকলি অতটা চিনত না। নানা প্রশ্ন করতেন, এরপর কেউ কেউ কিনতেন। এখন কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আর পাঁচটা সবজির মতো বেশির ভাগ ক্রেতা ব্রকলি কিনছেন।
ইউরোপে প্রথম আবাদ
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রকলি হলো বাঁধাকপি ও ফুলকপি প্রজাতির একটি সবজি। ‘ব্রকলি’ শব্দটি এসেছে ইতালীয় ‘ব্রক্কোলো’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ফুলের ডগা বা কুঁড়ি। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে ইতালি ও গ্রিসের উপকূলীয় এলাকায় এর উৎপত্তি।
ব্রকলি কাঁচা ও রান্না—উভয় উপায়ে খাওয়া যায়। বর্তমানে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্মুক্ত মাঠভিত্তিক চাষপদ্ধতি ও গ্রিনহাউস–ব্যবস্থায় উৎপাদিত হচ্ছে। ব্রকলি একটি লাভজনক ফসল। কারণ, বাজারে এর চাহিদা ও দাম উভয়ই বেশি। তুলনামূলক স্বল্প সময়ে ব্রকলি চাষ করে ফসল তোলা যায়। ব্রকলি বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলের সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ হওয়া ও বৈশ্বিকভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে রপ্তানিপণ্য হিসেবে অনেক দেশ ব্রকলির উৎপাদন বাড়াচ্ছে।
দেশে চাষ কবে থেকে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঢাকা কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা অঞ্চলে কৃষকদের নিয়ে প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্রকলিসহ কিছু উচ্চমূল্যের সবজি চাষ বাড়াতে কাজ করছে। প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম মজুমদার জানান, বাংলাদেশে ২০০০ সালের দিকে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক ব্রকলির চাষাবাদ শুরু হয়। এর প্রায় এক দশক পরে ব্রকলির বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। তবে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাজারে ব্রকলির তেমন চাহিদা দেখা যায়নি। ২০২২ সাল থেকে ব্রকলির চাহিদা বাড়তে থাকে। এতে চাষাবাদও বাড়ে। এখন ব্রকলি দেশের শীতকালীন সবজির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কমবেশি ব্রকলির চাষ হচ্ছে। মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, যশোর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ব্রকলি চাষ হয়।
উৎপাদন কেমন
এফএওর প্রতিবেদনে ব্রকলি ও ফুলকপির দুই সবজির হিসাব একত্রে করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ব্রকলির উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ২০১৯ সালে ব্রকলির উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৬০৪ কোটি টন। ২০২৩ সালে এটি বেড়ে ২ হাজার ৬৪৭ কোটি টনে পৌঁছেছে। ব্রকলি চাষে শীর্ষ দেশগুলো হচ্ছে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, স্পেন, ইতালি, তুরস্ক, বাংলাদেশ, পাকিস্তান। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ চাষ হয় শুধু চীন ও ভারতে।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে বাংলাদেশে ২০২৩ সালে ৩ লাখ ৪৭ হাজার টন ফুলকপি ও ব্রকলি উৎপাদিত হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছ থেকে বা সরকারি অন্য কোনো সংস্থায় দেশে ব্রকলি উৎপাদনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য আলাদাভাবে পাওয়া যায়নি।
লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার চাষি মানিক ইসলাম চার বছর ধরে ব্রকলির চাষ করছেন। তিনি জানান, একটি বীজ কোম্পানি পরীক্ষামূলক চাষের জন্য প্রথমবার তাকে কিছু ব্রকলির বীজ দিয়েছিল। সেগুলো থেকে উৎপাদিত ব্রকলি বিক্রি করে লাভবান হন। এরপর গত তিন বছর নিয়মিত ব্রকলি চাষ করছেন তিনি।
মানিক ইসলাম বলেন, ‘আমি ফুলকপি ও ব্রকলি চাষ করি। উভয় সবজির খরচ মোটামুটি একই রকম। কিন্তু মাঠ থেকে কৃষকেরা মাঝারি ও বড় আকারের প্রতিটি ফুলকপি ২২–২৫ টাকায় বিক্রি করেন। সেখানে একই আকারের প্রতিটি ব্রকলির দাম পাওয়া যায় ৩০–৩৫ টাকা।’
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ব্রকলি চাষের উপযুক্ত সময় নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস। তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে আগাম চাষ করলে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। বাজারে সব সময়ই ব্রকলির ভালো দাম পাওয়া যায়। কিন্তু ফুলকপির দাম হঠাৎ পড়ে যায়। বাজারে ব্রকলির নির্দিষ্ট একটি চাহিদাও রয়েছে। এসব কারণে অনেক কৃষক বর্তমানে ব্রকলি চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকা কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম মজুমদার জানান, ব্রকলি চাষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাপমাত্রা। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ব্রকলির ফলন কমে যায়। এ কারণে ব্রকলি চাষের জন্য শীতকালীন আবহাওয়া সবচেয়ে বেশি উপযোগী। প্রতি হেক্টরে ব্রকলির গড় ফলন হয় ১৫ থেকে ২০ টন। তবে উন্নত ব্যবস্থাপনায় এই ফলন ২২ থেকে ২৫ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।