আইএমএফের প্রাক্কলন
রপ্তানি ৫ বছর পর ৭০০০ কোটি ডলার ছাড়াবে
চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমবে। পরের অর্থবছর থেকে বাড়তে বাড়তে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা দাঁড়াবে ৭,০৫৮ কোটি ডলার।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে আশাবাদ দেখছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ আগামী ২০২৬ পঞ্জিকা বছরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। এ জন্য কিছু সুবিধা কমবে, যেগুলো এত দিন অন্য সব এলডিসির মতো বাংলাদেশ পেয়ে আসছিল।
আইএমএফ প্রাক্কলন করে বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হবে ৭ হাজার ৫৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৬৯০ কোটি ডলার। গত ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক সম্পর্কে যে প্রাক্কলন করেছে, তাতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয় বর্তমানে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধায় পণ্য রপ্তানি করা যায়। ২০২৯ সাল পর্যন্ত এ সুবিধা বহাল থাকবে। এটাকেও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে রপ্তানি আয় কমে ৪ হাজার ৬৫৪ কোটি ডলারে নামবে, যা এর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরের ছিল ৪ হাজার ৯২৫ কোটি ডলার। তবে তারপরের অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকেই রপ্তানি আয় বাড়তে থাকবে বলে সংস্থাটি মনে করে।
ইইউভুক্ত দেশগুলোয় শ্লথ প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা থেকে যাওয়ায় আইএমএফ কিছুটা রক্ষণশীল প্রাক্কলনই করেছে। এ লক্ষ্য অর্জন করা খুবই সম্ভব।খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি
আইএমএফের প্রাক্কলনে বলা হয়েছে, রপ্তানি আয় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ হাজার ১৮৬ কোটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৭৭৯ কোটি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৩০ কোটি ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ হাজার ৫৮ কোটি ডলার হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ‘মনে হয় আমরা একটু বাড়িয়ে বলেছি, আর আইএমএফ একটু কমিয়ে বলেছে। রপ্তানি আয় আইএমএফের অনুমানের চেয়েও বেশি হওয়া সম্ভব। কারণ, আমাদের সক্ষমতা ও অদম্য উৎসাহ আছে। যদিও আমাদের কৌশলগত ঘাটতি রয়েছে।’
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে মোট রপ্তানি আয় যে ৪ হাজার ৯২৫ কোটি ডলার হবে, তার মধ্যে পোশাক খাত থেকে আসবে ৪ হাজার ২৬১ কোটি ডলার। বাকিটা আসবে সেবাপণ্য রপ্তানি করে। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ হাজার ৫৮ কোটি ডলারের মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে পোশাক খাতের অংশ হবে ৫ হাজার ৭৪২ কোটি ডলার। বাকি ১ হাজার ৩১৬ কোটি ডলার আসবে সেবাপণ্য রপ্তানি থেকে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি, পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও তদারকের বিষয়ে ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্যসচিব আহমদ কায়কাউসের নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। কমিটির এক প্রতিবেদনে এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের নতুন ভাবমূর্তি এবং ব্র্যান্ডিং বাড়বে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) গত আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছিল, সরকারের নীতিসহায়তার পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানির আয়ই দাঁড়াবে ১০ হাজার কোটি ডলার।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে পোশাক পণ্যের বহুমুখীনতা নিয়ে কাজ চলছে। উচ্চমূল্যের পোশাকও রপ্তানি হচ্ছে এখন, যা আগে হতো না। ফলে রপ্তানি আয়ে আমরা আইএমএফের প্রাক্কলনকে ছাড়িয়ে যাব বলে আশা করছি।’
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২০২০ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি আয় কমবে ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চ শুল্কে রপ্তানি করতে হবে বলে দেশীয় মুদ্রায় আয় কমতে পারে কমপক্ষে ৫১ হাজার কোটি টাকার মতো।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ইইউভুক্ত দেশগুলোয় শ্লথ প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা থেকে যাওয়ায় আইএমএফ কিছুটা রক্ষণশীল প্রাক্কলনই করেছে। এ লক্ষ্য অর্জন করা খুবই সম্ভব।’