বন্দরের অচলাবস্থা জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে: মাসরুর রিয়াজ

সরবরাহ খাতের প্রেক্ষাপট নির্মাণ: প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয় শীর্ষক একটি অংশীজন আলোচনায় উপস্থিত অতিথিরা। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলেছবি: অ্যামচেমের সৌজন্যে

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, লজিস্টিকস বা সরবরাহ খাত বিঘ্নিত হলে কিংবা বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগকে কেন্দ্র করে শ্রমিক ধর্মঘটে সৃষ্ট অচলাবস্থার উদাহরণ টেনে তিনি এ কথা বলেন।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘সরবরাহ খাতের প্রেক্ষাপট নির্মাণ: প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এক অংশীজন আলোচনায় এ কথা বলেন মাসরুর রিয়াজ। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। আলোচনায় সরবরাহ খাতের বিভিন্ন অংশীজন, উন্নয়ন সহযোগী এবং ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। এতে বন্দর জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কার্যত প্রায় অচলাবস্থা চলছে বন্দরে।

এ প্রসঙ্গ টেনে আলোচনা সভায় মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির আকারের তুলনায় আমাদের বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা এখনো অনেক কম। সম্প্রতি বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের কারণে বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা ইতিমধ্যে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যতে বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ নতুন বন্দর প্রকল্পগুলোতে যদি পিপিপি পদ্ধতিতে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করা না যায়, তাহলে দেশের প্রয়োজনীয় বন্দরসক্ষমতা তৈরি হবে না। এতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাও কমে যাবে।

মাসরুর রিয়াজ জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাক্কলিত ৭৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপির লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দেশের লজিস্টিকস অবকাঠামো ও বন্দরসক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, লজিস্টিকস ব্যয় মাত্র ১ শতাংশ কমানো গেলে রপ্তানি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় তিনি জাতীয় লজিস্টিকস নীতি বাস্তবায়নে বিদ্যমান কয়েকটি বড় ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের সরবরাহ খাত সময়ের সঙ্গে কিছুটা বিকশিত হলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের তুলনায় এখনো পিছিয়ে রয়েছে। দেশীয় পর্যায়ে এর গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবিত হয় না। সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন, ডিকার্বনাইজেশন ও জ্বালানি রূপান্তর, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিকীকরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা—এই বৈশ্বিক প্রবণতাগুলো দ্রুত সরবরাহ খাতকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চাহিদা পূরণে বিদ্যমান জ্ঞান ও সক্ষমতার ঘাটতি দূর করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে এয়ার লজিস্টিকস ও এক্সপ্রেস কুরিয়ার খাতে বিদ্যমান নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন সিএফ গ্লোবালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম। তিনি বলেন, ই-কমার্সনির্ভর এক্সপ্রেস লজিস্টিকসের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ঢাকার বিমানবন্দরে লজিস্টিকস ব্যয় সড়ক পরিবহনের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য কার্গো ক্লিয়ারেন্স সুবিধা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট এবং সংশ্লিষ্ট খালাসপ্রক্রিয়া এখনো চালু হয়নি। এটি রপ্তানি ও এক্সপ্রেস কার্গো কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ পরিবহনবিশেষজ্ঞ নুসরাত নাহিদ ববি বলেন, ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতে যে সংস্কারের গতি তৈরি হয়েছে, নতুন সরকারের উচিত তা স্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও উচ্চপর্যায়ের ঐকমত্যের মাধ্যমে আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নেওয়া। স্বল্প মেয়াদে জাতীয় লজিস্টিকস নীতি দ্রুত অনুমোদন ও কার্যকর করা, এনএলপি ২০২৫ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি লজিস্টিকস বিভাগ গঠন এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার ও ডিজিটাল উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

সিটিব্যাংক এনএর বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিসার মো. মইনুল হক শুল্ক আইন ২০২৩-এর বিধান দ্রুত কার্যকর করার ওপর জোর দেন। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক নথি দাখিল ও ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।