নতুন শর্তগুলো সম্পর্কে গভর্নর কিছু ধারণাও দিয়েছেন সাংবাদিকদের। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন করা, রাজস্ব সংগ্রহ কার্যক্রমকে গতিশীল করা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা, ব্যাংক খাতে সুশাসন আনা ও খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা ইত্যাদি। ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমানোর শর্তও সংস্থাটি দিতে পারে। সুনির্দিষ্ট আরও শর্ত পাওয়া যাবে আইএমএফের দল বাংলাদেশ সফর করে চলে যাওয়ার সময়। দলটি চলতি মাসেই ঢাকা আসছে।

আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, যেসব শর্ত আইএমএফ দেবে বলে শোনা যাচ্ছে, সেগুলো এমনিতেই সরকারের করা উচিত। শর্তগুলো পূরণে সরকার কতটা আন্তরিক হবে, সেটা বরং বড় প্রশ্ন। এর বাইরে সুদের হার নিয়েও আইএমএফের কথা বলার কথা। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্বের প্রায় সব দেশ সুদের হার বাড়িয়েছে। উচ্চ সুদের সঙ্গে বিনিয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই। সুদের হার বেশি থাকার সময় যে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ছিল, এখন তো তা আরও কম।

ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রার মান কমে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপকে উসকে দিয়েছে সরকার নিজেই। মাঝখানে আমদানি বেড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির এসব সূচকের স্বীকারোক্তি দিয়েই ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গভর্নর।

ঋণের বিপরীতে আইএমএফের সম্ভাব্য শর্ত পূরণে সরকারের প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮ শতাংশই ছাড়িয়ে যেতে পারেনি বাংলাদেশ। এ হার রাতারাতি উন্নীত করে ফেলতেও বলবে না আইএমএফ। তবে কোন বছরে কতটা উন্নীত করবে—বাংলাদেশের কাছে তার একটা সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন চাইবে সংস্থাটি। সরকার ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে একটি পরিকল্পনা তৈরিও করেছে বলে জানা গেছে।

আইএমএফ এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনার হিসাব ঠিক করতে বলবে এবং আয়কর আইন ও শুল্ক আইন পাস করার শর্ত দেবে। আর চাইবে তৃণমূল পর্যায়ে কর আদায়ের প্রশাসনকে ছড়িয়ে দিতে এবং কর প্রশাসনকে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মধ্যে আনতে। জানা গেছে, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিয়েও আইএমএফ কথা বলবে। আর সুদের হার বেঁধে দেওয়ার যে বিপক্ষে তারা, তা–ও বলবে।

রিজার্ভ গত বছরের আগস্টে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছিল। তা থেকে কমে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে নেমেছে বর্তমানে। বিভিন্ন খাতে রিজার্ভ থেকে দেওয়া আছে ৮০০ কোটি ডলার। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার।

আইএমএফের চাওয়া অনুযায়ী রিজার্ভ গণনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে একটা সমীক্ষা চলছে। তা শেষ হওয়ার পর এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।

ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ নিয়ে সব সময়ই প্রশ্ন আছে আইএমএফের। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো উন্নতি নেই। আইএমএফ উন্নতির শর্ত দেবে। তবে অতটা কঠোরভাবে বলবে না। কারণ, আইএমএফ জানে, ব্যাংক খাতে সুশাসন আনা বা খেলাপি পরিস্থিতির উন্নয়ন সরকারের পক্ষে সহজ কাজ নয়। ঋণের শর্তে বেশি কঠোর থাকলে পুরো আলোচনাই তখন ভেস্তে যেতে পারে। ওয়াশিংটনে বৈঠকে অংশ নেওয়া সূত্রে এমন আভাস পাওয়া গেছে।