প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ক্ষুদ্রঋণবান্ধব নয়

বিবৃতিপ্রতীকী ছবি

‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ ইতিবাচক ও নীতিগতভাবে প্রশংসনীয়। তবে প্রস্তাবিত এ অধ্যাদেশ ক্ষুদ্রঋণ খাতবান্ধব নয়। সরকার যেভাবে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক করার উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে এ খাতের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং খাতটির জন্য নতুন করে সংকট তৈরি হবে।

দেশের ১৭টি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার পক্ষ থেকে আজ রোববার এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশের খসড়া গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এটি ক্ষুদ্রঋণ খাতের বাস্তবতা ও খাতটির প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এ অধ্যাদেশ কার্যকর হলে গত কয়েক দশকে ক্ষুদ্রঋণ খাতের অর্জন এবং দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে এ খাতের ইতিবাচক ভূমিকা গুরুতরভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অধ্যাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকে রূপান্তরের যে ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান একটি উন্নয়নভিত্তিক, অলাভজনক ও দরিদ্রবান্ধব প্রক্রিয়ায় পরিচালিত ব্যবস্থা। আর ব্যাংক মূলত মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। প্রস্তাবিত এ রূপান্তরের ফলে ক্ষুদ্রঋণ খাত তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং ধীরে ধীরে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এ সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, কীভাবে বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকে রূপান্তরিত হবে, সে বিষয়ে অধ্যাদেশে কোনো সুস্পষ্ট, নির্দিষ্ট বা বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা নেই। বরং এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে দেশি ও বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, এমনকি করপোরেট বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের লাইসেন্স গ্রহণের পথ উন্মুক্ত হবে। এতে ক্ষুদ্রঋণ খাতে অনৈতিক চর্চা, অতিরিক্ত মুনাফা লোভ ও সুশাসন সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আর্থিক খাতের বিদ্যমান সমস্যা যেমন খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব ক্ষুদ্রঋণ খাতেও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা এ খাতের গত কয়েক দশকের অর্জনকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, অধ্যাদেশে ‘একাধিক ব্যক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে’ ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করার মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানার ধারণা প্রবর্তিত হয়েছে, যা ক্ষুদ্রঋণ খাতের স্বকীয়তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও উন্নয়নকামী চরিত্রকে দুর্বল করবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) সনদ পাওয়া যেসব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকে রূপান্তরের সম্ভাবনা বা আগ্রহ থাকতে পারে, তাদের সঙ্গে এই অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে কোনো আলোচনা বা মতামত গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অধ্যাদেশ প্রণয়নের প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করা হোক এবং অংশীজনের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে পরবর্তী পর্যায়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, আশার প্রেসিডেন্ট মো. আরিফুল হক চৌধুরী, বুরো বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম, সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সন্তোষ পাল, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের নির্বাহী পরিচালক মো. আলাউদ্দিন খান, সাজেদা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাহিদা ফিজ্জা কবির, অন্তর সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্টের প্রধান উপদেষ্টা মো. এমরানুল হক চৌধুরী, পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সালেহ বিন শামস, বাসা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আ ক ম সিরাজুল ইসলাম, ঘাসফুলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আফতাবুর রহমান জাফরি, কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করীম চৌধুরী, পিবিকের নির্বাহী পরিচালক খালেদা শামস, সিদিপের নির্বাহী পরিচালক মিফতা নাইম হুদা, আরডিআরএসের নির্বাহী পরিচালক ইমরুল কায়েস মুনিরুজ্জামান, কোডেকের নির্বাহী পরিচালক খুর্শিদ আলম এবং এফডিএ ফরিদপুরের নির্বাহী পরিচালক মো. আবু ছাহের আলম।