পদ্মা নদীর ছোট চরে গরুর বড় উৎস

ঢাকায় পাঠানোর জন্য খামারি ও গৃহস্থরা গরু নিয়ে এসেছেন। সম্প্রতি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর হালিম মাস্টারের ঘাটের পাশেছবি: প্রথম আলো

রাজ্জাক মণ্ডল একটি গরুর দড়ি ধরে আগে আগে হেঁটে যাচ্ছেন। মাঝখানে তাঁর ছেলে নাজমুল মণ্ডলের হাতে একটি গরু। আর পেছনে স্ত্রী রাজিয়া খাতুন আরও একটি গরু নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। বাড়িতে পোষা তিনটি গরু বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকায়। গরুগুলোকে ব্যাপারীর ট্রাকে তুলে দিতে যাচ্ছেন তাঁরা। রাজিয়ার মুখে এ কথা শুনে মনের মধ্যে নদীভাঙা মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার একটি ছবি ভেসে উঠল।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর হালিম মাস্টারের ঘাটের পাশে সম্প্রতি এক বিকেলে পরিবারটির সঙ্গে দেখা হয়। সেদিন চরের গ্রামগুলোতে ঘুরে গরু নিয়ে একই ধরনের কারবার চোখে পড়ে। কোথাও খামারিরা বসে গরুর জন্য খড়ের আঁটি বাঁধছেন, কোথাও দুপুরের খাবার খেয়ে নিচ্ছেন। পাশেই বিভিন্ন গাছের সঙ্গে সারি সারি গরু বেঁধে রাখা হয়েছে। আর গ্রামের পথে পথে গরু নিয়ে যাওয়ার এই দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রতিটি গরুই দর্শনদারি। হেলেদুলে হাঁটছে। কোনোটি বেয়াড়া। যেতে চাইছে না। উল্টো দিকে টান দিচ্ছে। দু-তিনজন মিলে তাকে বাগে আনার চেষ্টা করছেন।

গত শনিবার রাতে পদ্মা নদীর ঘাটের ইজারাদার মো. আবু হানিফ একটি হিসাব দেন। তাতে দেখা যায়, বুধবার থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত পদ্মা নদীর চারটি ঘাট দিয়ে চর থেকে ঢাকার উদ্দেশে ১০৯ ট্রাক গরু পার হয়েছে। প্রতিটি ট্রাকে ১৮ থেকে ২০টি গরু নেওয়া হয়। ট্রাকগুলো সব ঢাকার বিভিন্ন পশুহাটের উদ্দেশে রওনা দেয়।

বাঘা উপজেলার চকরাজাপুরের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন নদীভাঙনের কারণে সম্প্রতি দৌলতপুর উপজেলার মানিকের চরের তেমাদিয়া গ্রামে তাঁর বাড়ি স্থানান্তর করেছেন। তিনি দুটি গরু নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার চকরাজাপুর নদীর ঘাটে তাঁর সঙ্গে প্রথম আলো প্রতিবেদকের দেখা হয়। নদীর ঘাটেই তিনটি ট্রাকে গরু বোঝাই করার প্রস্তুতি চলছে। দেলোয়ার হোসেন জানান, ঢাকার বাজারে দুটি গরু আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি হবে এমন আশায় আছেন।

সেই ঘাটেই দেখা হয় চকরাজপুরের খামারি জাহের আলী শেখের সঙ্গে। জানালেন, তাঁর নিজের চারটা ও ভাইয়ের চারটা গরু নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন। চারটা গরুর দাম ৭ লাখ হতে পারে। তিনি দিয়াবাড়ি বাজারে যাবেন। তাঁর ধারণা, শুধু চকরাজাপুর ইউনিয়ন থেকেই ৫০ ট্রাক গরু এবার ঢাকায় যাবে।

সেখানে গরু নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তমসু মোল্লা। এবার সাতটি গরু নিয়ে যাবেন কমলাপুর স্টেশনের পাশের গরুহাটে। সাতটা গরুর দাম ১২ লাখ টাকা আশা করছেন।

তমসু মোল্লা বলেন, চরের মানুষ চিরকাল নদীভাঙনের শিকার। যাঁর একসময় ২০ বিঘা জমি ছিল, এখন তাঁর বাড়ির ভিটাও নেই। বাধ্য হয়ে তাঁরা গরু-ছাগল লালন পালন করেন। কারও বাড়িতে দুটি, কারও বাড়িতে তিনটি, কারও বাড়িতে চারটি গরু রয়েছে। আবার কারও বাড়িতে ছোট ছোট অনেক গরু থাকে। একটু বড় হলেই বিক্রি করে দেন। তাঁরা গরুর পাল নিয়ে এক চর থেকে আরেক চরে যান। এমন ছোট গরুর পাল আছে চকরাজাপুরের জামাল খামারির। তাঁর পালে এখন ৬০টা গরু আছে।

তমসু মোল্লা আরও বলেন, চরে এমন কোনো বাড়ি পাবেন না, যে বাড়িতে দুইটা গরু নেই। কোরবানির বাজার ধরার জন্য তাঁরা সারা বছর গরু পালেন।

হালিম মাস্টারের ঘাটে দেখা হয় আরেক খামারি সাদেক মোল্লার সঙ্গে। তাঁর মোট ২০টি গরু। নিজে পুষেছেন ছয়টি আর বাকিগুলো কিনেছেন। ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য গরুগুলো ট্রাকে তোলার প্রস্তুতি চলছিল। তিনি বললেন, আগে শুধু গরু পুষতেন। পাঁচ বছর ধরে গরুর ব্যবসা করছেন। গরুর দামের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো গ্যারান্টি নাই। অনেক সময় কোনোটাতে পাঁচ হাজার টাকা লাভ হয় আবার কোনোটা ফেরত আসে।’

গরু ব্যবসায়ী আবু বক্করকে পাওয়া গেল সেই ঘাটে। তাঁর নিজের মোট ছয়টি গরু আছে। জানান, দুটি কিনেছেন আর চারটা নিজের বাড়িতে পোষা। তিনি আশা করছেন, তাঁর ছয়টি গরুর দাম ১২ লাখ টাকার বেশি হবে।

নদীর ঘাটেই একটি আমবাগানের মধ্যে সবাই গরু এনে জড়ো করেন। তাঁদের সঙ্গে পরিবারের ছেলেমেয়েরাও আসে। সেখানে চাঁদপুর গ্রামের আম্বিয়া বেগম জানান, নিজের পোষা তিনটি গরুর জন্য খুব মায়া লাগছে। তাই এসেছেন। সঙ্গে দুই মেয়ে ও এক ছেলেও এসেছেন। ছেলেটি ছোট। সকাল থেকে তার মন খরাপ। কারণ, গরু বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

আর চরকরাজাপুর ইউনিয়নের নিচ পলাশী ফতেপুর গ্রামের আরিফুল ইসলামের বাবা গত বছর গরু নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। আরিফুল বাবার লাশ নিয়ে বাড়ি এসেছিল। দাফন শেষে আবার গরুর হাটে গিয়েছিল। সে এবার দশম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাড়িতে এবার তিনটি গরু পোষা হয়েছিল। পরিবারের লোকজন তাকে গরুগুলো নিয়ে ঢাকায় যেতে দেননি। বাড়ি থেকেই দুটি গরু বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আর একটি আগামী বছর বিক্রির জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে বলে আরিফুল জানায়।