চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের উন্নয়নে এডিবির অর্থায়ন চায় সরকার
আকাশপথে চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক সংযোগকেন্দ্র করার উদ্যোগ। প্রথম ধাপে বিনিয়োগ ৩০ কোটি ডলার।
বছরে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি যাত্রী ও ১ লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমান চলাচল ও পণ্য পরিবহনের কেন্দ্রে রূপ দিতে নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটিতে অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টরকে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটিকে সংস্থাটির ‘ইন্টেগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ (আইজিএনডি) শীর্ষক উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব’ প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।
গত মে মাসে আইজিএনডি উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ৫ বিলিয়ন তথা ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়নের পরিকল্পনার কথা জানায় এডিবি। সংস্থাটির ভাষ্য, এই উদ্যোগের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও অঞ্চলভিত্তিক সুষম প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
ইআরডির চিঠি অনুযায়ী, বিমানবন্দরের অবকাঠামো ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা দূর করে চট্টগ্রামকে কার্যকর আঞ্চলিক এভিয়েশন গেটওয়েতে পরিণত করাই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে বড় যাত্রীবাহী ও কার্গো উড়োজাহাজ পরিচালনা, দ্রুত উড়োজাহাজ ওঠানামা, আধুনিক পণ্য ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক, রেল ও এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
কেন এই প্রকল্প
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলেও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক সংযোগ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। একসময় চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও নেপালে সরাসরি ফ্লাইট বা উড্ডয়ন ছিল। যাত্রীদের এখন অনেক গন্তব্যে ঢাকা হয়ে যেতে হয়।
২০২৩ সালে শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন হয়েছিল ৯ লাখ ৭৭ হাজার। ২০২৫ সালেও সেই সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল।
পণ্য পরিবহনেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানি পণ্য ঢাকায় নিয়ে সেখান থেকে উড়োজাহাজে বিদেশে পাঠাতে হয়।
এ রকম পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক গত ১৫ আগস্ট অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চিঠি দিয়ে শাহ আমানত বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
এ নিয়ে আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পায়নকে ঘিরে চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। কিন্তু এখান থেকে নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট নেই, অনেক আন্তর্জাতিক গন্তব্যেও সরাসরি যাওয়া যায় না। এ কারণে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
প্রথম ধাপে ২৮–৩০ কোটি ডলার
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ধাপ ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ধাপে সরকারি বিনিয়োগের প্রাথমিক হিসাব ২৫ কোটি মার্কিন ডলার। হোটেল, কনভেনশন সেন্টার, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনায় বেসরকারি খাত থেকে আরও ৩ থেকে ৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রথম ধাপে সম্ভাব্য বিনিয়োগ দাঁড়াতে পারে ২৮ থেকে ৩০ কোটি ডলার। ইআরডি জানিয়েছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্পের আকার ও ব্যয় পরিবর্তিত হতে পারে।
রানওয়ে, টার্মিনাল ও কার্গো হাব
বর্তমানে শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার এবং প্রস্থ ৪৫ মিটার, যা নতুন প্রকল্পে বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করতে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হতে পারে।
একই সঙ্গে সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে, দ্রুত বের হওয়ার ট্যাক্সিওয়ে, বড় উড়োজাহাজের জন্য ছয় থেকে আটটি পার্কিং স্ট্যান্ড এবং প্রায় ছয়টি বোর্ডিং ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
যাত্রী টার্মিনাল সম্প্রসারণ ও পুনর্বিন্যাস করে প্রথম ধাপে বছরে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেড় কোটি থেকে ২ কোটি পর্যন্ত করা হবে।
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে বছরে ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টনে উন্নীত করা হবে। প্রস্তাবিত কার্গো হাবে বন্ডেড গুদাম, এক্সপ্রেস কার্গো, ই-কমার্স সুবিধা, হিমাগার ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থাসম্পন্ন।
আঞ্চলিক হাব ও এয়ার-সি করিডর
চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক সংযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পৃথক ‘রিজিওনাল ট্রান্সফার সেন্টার’ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে অন্য দেশের যাত্রীরা এই বিমানবন্দরে ট্রানজিট ও ট্রান্সফার সুবিধা পাবেন।
একই সঙ্গে বিমানবন্দরকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, লজিস্টিকস কেন্দ্র ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যতে ‘এয়ার-সি লজিস্টিকস করিডর’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। রেল সংযোগ ও উড়াল এক্সপ্রেসওয়ের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হবে।
তবে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক রুট ও কার্গো ফ্লাইট আকৃষ্ট করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই আঞ্চলিক হাব গড়ে ওঠে না। এর জন্য যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বাস্তব চাহিদাও নিশ্চিত করতে হয়। প্রয়োজনে এয়ারলাইনস আকৃষ্ট করতে প্রণোদনামূলক ট্যারিফও বিবেচনা করতে হতে পারে।