চট্টগ্রামের লালদিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগে প্রথম কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ শুরু

আজ চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণকাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এটি নির্মাণ করছেছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়ার চরে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। আজ রোববার সকালে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

ডেনমার্কের মায়ের্সক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস এই টার্মিনাল নির্মাণে ৭৬ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় যা প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।

অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের লালদিয়ায় এপি মুলারের টার্মিনাল নির্মাণ বড় মাইলফলক। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি লজিস্টিক হাব (বাণিজ্য ও পরিবহনকেন্দ্র) হয়ে উঠবে। লালদিয়া প্রকল্প ছাড়াও আমরা বঙ্গোপসাগরের উপকূলরেখাজুড়ে আরও বেশ কয়েকটি বড় বন্দরসুবিধা, প্রকল্প ও লজিস্টিক সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা করছি।’

গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের এ–সংক্রান্ত চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় গত ২২ এপ্রিল লালদিয়ার ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমি এপিএমকে বুঝিয়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

নকশা প্রণয়নের পর এবার শুরু হলো নির্মাণকাজ। সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা আছে। ২০৩০ সালে চালু হবে টার্মিনাল। একটানা ৩০ বছর এটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এপিএম টার্মিনালসের এই প্রকল্পে লোকাল পার্টনার হিসেবে আছে দেশীয় কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড।

বিনিয়োগ বেড়ে ৭৬ কোটি ডলার

চুক্তির সময় লালদিয়া টার্মিনালে ৫৫ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের কথা জানিয়েছিল এপিএম টার্মিনালস। এখন প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭৬ কোটি ডলারে।

এই বিনিয়োগে টার্মিনাল অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হবে। প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ টার্মিনালে ৭টি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ প্রায় ৮০ ধরনের যন্ত্রপাতি থাকবে। যন্ত্রপাতির বড় অংশ জ্বালানির পরিবর্তে বিদ্যুতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

জার্মানভিত্তিক পরামর্শক হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো–নামানোর সক্ষমতা রয়েছে। লালদিয়া চালু হলে আরও ৯ লাখ একক কনটেইনারের সক্ষমতা যুক্ত হবে। তাতে বন্দরের মোট সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে বছরে প্রায় ৪৪ লাখ একক কনটেইনার।

বড় জাহাজ ভেড়ানোয় লালদিয়া টার্মিনালের বড় সুবিধা এর অবস্থান। সাগর থেকে কর্ণফুলী নদীর উজানে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে যেতে জাহাজকে তিনটি বাঁক অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে গুপ্ত বাঁক সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। লালদিয়ার অবস্থান এই বাঁকের আগে, সাগর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে।

বর্তমানে বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফট এবং ২ হাজার ৮০০ একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যায়। এপিএম টার্মিনালসের তথ্য অনুযায়ী, লালদিয়ায় সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের প্রায় ৬ হাজার একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে।

৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে একসঙ্গে ৩টি তুলনামূলক ছোট জাহাজ অথবা দুটি বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ থাকবে। নৌপথের অবস্থানের কারণে রাতেও জাহাজ চলাচলের সুবিধা বাড়বে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

বন্দরের আয়ও হবে

টার্মিনাল নির্মাণে সরাসরি অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে; বরং টার্মিনাল পরিচালনা থেকে নির্ধারিত হারে অর্থ পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চুক্তি অনুযায়ী, বছরে প্রথম ৮ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো–নামানো পর্যন্ত প্রতিটির জন্য এপিএম টার্মিনালসের কাছ থেকে ২১ ডলার করে পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত প্রতিটি কনটেইনারের জন্য পাওয়া যাবে ২৩ ডলার। টার্মিনাল চালুর আগে এককালীন ফি হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে ২৫০ কোটি টাকা।

তবে বন্দর ব্যবহারকারীরা সরাসরি এই আর্থিক আয়ের চেয়ে বন্দরের সক্ষমতা ও সেবায় প্রতিযোগিতা তৈরির বিষয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এত দিন বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় সে অর্থে প্রতিযোগিতা ছিল না। বিশ্বখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান লালদিয়া টার্মিনাল পরিচালনায় এলে বন্দরের সেবায় প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। তাঁর মতে, বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত এই টার্মিনাল বন্দরসেবা ও সেবার মান বাড়ানোর নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

এপিএম টার্মিনালসের বৈশ্বিক সক্ষমতা কত

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম টার্মিনাল অপারেটর এপিএম টার্মিনালস অন্যতম বড় কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। লয়েডস লিস্টের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনার ওঠানো–নামানোর হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। ২০২৪ সালে এপিএম টার্মিনালস ৫ কোটি ৩২ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো–নামানো করেছে, যা বিশ্বের মোট কনটেইনার পরিবহনের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

এর মূল প্রতিষ্ঠান মায়ের্সক বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কনটেইনার শিপিং কোম্পানি। আলফালাইনারের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বহরে রয়েছে প্রায় ৭৫০টি কনটেইনার জাহাজ। লালদিয়া প্রকল্পে এপিএম টার্মিনালসের স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস। প্রতিষ্ঠানটি দেশে একটি কনটেইনার ডিপো পরিচালনার পাশাপাশি শিপিং কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট হিসেবেও কাজ করছে।

বিদেশি বিনিয়োগে প্রথম

বাংলাদেশে কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠান অবশ্য আগেই যুক্ত হয়েছে। সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) ২০২৪ সাল থেকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে। তবে ওই টার্মিনাল নির্মাণ করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া পানগাঁও নৌ টার্মিনালের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হয়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার প্রক্রিয়াও চলছে। লালদিয়া সেদিক থেকে ব্যতিক্রম। বন্দরের দেওয়া খালি জমিতে বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল তৈরি ও পরিচালনা—সবই করবে এপিএম টার্মিনালস। অর্থাৎ, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে শুধু তৈরি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পরিবর্তে বিদেশি বিনিয়োগে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের যাত্রা লালদিয়ার মাধ্যমেই প্রথম শুরু হলো।

বক্তারা যা বললেন

নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘আজ নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। আমাদের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানের হতে চলেছে। এপিএম টার্মিনাল লালদিয়া পিপিপি পদ্ধতিতে বড় বিনিয়োগ। অনেক ফ্যাসিলিটিজ থাকবে। নিশ্চয়ই এটি জাতির জন্য সুসংবাদ।’

অনুষ্ঠানে এপিএম টার্মিনালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রমেশ ডেভিড বলেন, পূর্ণাঙ্গ চালুর পর লালদিয়া টার্মিনালটি বছরে প্রায় ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হবে, যা বাংলাদেশের কনটেইনার পরিবহনসক্ষমতায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি যোগ করবে।

বক্তব্য দেন এপিএম টার্মিনালস বিভির গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লিমেন্টেশন জেক ক্রেইগ, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া। উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতসহ প্রমুখ।