বাংলাদেশকেও এই জোটে যোগ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং গত ৮ জুন এক অনুষ্ঠানে এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, ‘এসব জোট ছাড়াই আমরা ভালো আছি। আমরা উন্নয়নের পথে রয়েছি।’ তবে বাংলাদেশ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, বাংলাদেশ যেকোনো আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটে যোগ দেওয়ার আগে চিন্তা করবে, সেটা প্রকৃত অর্থনৈতিক জোট কি না। অর্থাৎ মোমেন বলতে চেয়েছেন, অর্থনৈতিক জোটের মোড়কে রাজনৈতিক জোট হলে বাংলাদেশ তাতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ভাববে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন একধরনের সংরক্ষণবাদ নীতি গ্রহণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বেশি বেশি মুক্ত বাণিজ্য জোটে যোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব বাড়ছে এবং নির্মাণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ট্রাম্প আমলের নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাইডেন নানা ধরনের উদ্যোগ নেন। আইপিইএফ জোট তার এ প্রচেষ্টারই অংশ।

বলা হচ্ছে, আইপিইএফ কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নয়; এটা একধরনের ফ্রেমওয়ার্ক। একসঙ্গে কাজ করার একধরনের প্রতিশ্রুতি। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে, আইপিইএফ মূলত কয়েকটি কাজ করতে চায়। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ডিজিটাল ইকোনমিতে জোর, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন, টেকসই সরবরাহব্যবস্থা চালু, অর্থনৈতিক সংস্কারকে এগিয়ে নেওয়া এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা।

আইপিইএফ গঠনের দেড় মাস পার হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ জোটের খুব বেশি তৎপরতা দেখা যায়নি। সমালোচকেরা বলছেন, এই জোট গঠনের উদ্দেশ্য যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। প্রেসিডেন্ট বাইডেন মূলত চীনের অর্থনৈতিক বিকাশকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে চান। অনেকেই একে চীনের বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডর বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে (বিআরআই) বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ২০১৩ সালে চীন বিআরআই গঠন করেছিল, এটিকে বেইজিংয়ের বৈশ্বিক শক্তির মহড়া হিসেবে দেখা হয়।

বিআরআই ছাড়া এ অঞ্চলে আরেকটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট রয়েছে, যার নাম রিজওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ ১৫টি দেশ নিয়ে এই জোট গঠিত হয় ২০২০ সালের নভেম্বরে। আইপিইএফে যারা নাম লিখিয়েছে, তাদের প্রায় সবাই আরসিইপিতে আছে। আরসিইপিকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল। বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ আরসিইপিভুক্ত দেশগুলোয় বসবাস করে। ভারত যোগ না দেওয়ায় চীনই এ জোটের নেতৃত্বে আছে। এই জোট আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে গত ১ জানুয়ারি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, আরসিইপিকে টেক্কা দেওয়ার জন্যই বাইডেন আইপিইএফ গঠন করেছেন।

আইপিইএফ গঠনের পেছনে একটা হাঁড়ির খবর প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা মেরি রাইমন্দ। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা চীনের বাইরে আইপিইএফভুক্ত দেশগুলোকে গিয়ে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বা পণ্য উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তুলতে চান। কিন্তু এ বক্তব্য কতটা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। কারণ, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দেশগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের রপ্তানির বাজার হিসেবে দেখে। আর চীন তাদের প্রধান সাপ্লাই চেইন পার্টনার। অর্থাৎ এসব দেশের বড় বড় কোম্পানি চীনের কারখানায় পণ্য উৎপাদন করিয়ে নেয়। অথবা পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করে। এসব পণ্য পরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় রপ্তানি করে। তাই চীনকে বাদ দিয়ে বা চীনের সহায়তা ছাড়া নতুন একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ গঠন করা কঠিনই বটে। আর চীন ১২০টিরও বেশি দেশের প্রধান বাণিজ্য সহযোগী। আইপিইএফভুক্ত দেশগুলোও সম্ভবত চায় না চীনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য সম্পর্ক কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হোক; বরং তারা এই ফ্রেমওয়ার্কের অধীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও শুল্ক ছাড় আশা করে।

চীন বলছে, আইপিইএফ কোনো প্রকৃত ফল এনে দিতে পারবে না। এটা ‘এম্পটি শেল’ ছাড়া আর কিছু নয়। তবে চীন যা-ই বলুক না কেন, এখনই এই অর্থনৈতিক ফ্রেমওয়ার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করা সঠিক হবে না। আইপিইএফ যদি প্রকৃতই অর্থনৈতিক জোট হিসেবে কাজ করে, তবে এর সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন