এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানে বাংলাদেশের বড় সুযোগ আছে: রেহমান সোবহান

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আজ বক্তব্য দেন রেহমান সোবহানছবি: প্রথম আলো

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়ার দিকে সরে আসছে। চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির উত্থানের সঙ্গে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খল ও বাজারের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে।

আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬–এ এ কথা বলেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। তাঁর মতে, চীন ও ভারতের মতো দুটি বড় অর্থনীতি বাংলাদেশের প্রতিবেশী। ফলে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করেছে।

রেহমান সোবহান পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন পশ্চিমা দেশগুলোর যে প্রভাব ছিল, তা খর্ব হচ্ছে। এশিয়া এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এশিয়ার দেশগুলোর পণ্য রপ্তানির সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। বৈদেশিক সাহায্য, বিনিয়োগ ও মূলধনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আগের মতো পশ্চিমা বিশ্বের ওপর অতটা নির্ভর করতে হচ্ছে না।

এশিয়াই এখন বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র

রেহমান সোবহান বলেন, বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে এশিয়া। এশিয়ার অধিকাংশ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারও এখন এই অঞ্চলের দেশগুলো। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের বাণিজ্যেও এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ছে।

শুধু বাণিজ্য নয়, প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি খাতে চীন এগিয়ে আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন, গবেষণাপত্র ও নিজস্ব স্বত্বের দিক থেকেও তারা এগিয়ে যাচ্ছে।

রেহমান সোবহানের মতে, চীন এখন বিশ্বের অনেক দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। ঋণ, সাহায্য ও মূলধনের ক্ষেত্রেও চীন গুরুত্বপূর্ণ। একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপ এই জায়গায় ছিল। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করত।

অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে শুল্কের ব্যবহার

এশিয়ার এই উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। তাঁর ভাষায়, অর্থনীতি এখন কৌশলগত ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। নানাভাবে এই চাপ দেওয়া হচ্ছে। যেমন কোনো কোনো দেশকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যঘাটতি কমাতে সেখান থেকে বেশি পণ্য কিনতে হবে। এমনকি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রেও চাপ দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপের কিছু দেশও এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রেহমান সোবহানের মতে, বাজারে প্রতিযোগিতা করে পণ্য বিক্রির বদলে রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে বাজার তৈরি করার চেষ্টা থেকে বোঝা যায়, বিশ্বায়ন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রেহমান সোবহান মনে করেন, এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান থামানো কঠিন। ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে চীন ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে চলতি মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) নিরিখেও চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশের জন্য কী সুযোগ

এই পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ আরও বাড়ানো, রেহমান সোবহান এ কথা বলেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো হাতে গোনা কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে দেশের আমদানি ও ক্রমবর্ধমান মূলধনের বড় অংশ এশিয়া থেকে আসছে। তাই এশিয়ার সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও জোরালোভাবে যুক্ত হওয়া দরকার।

রেহমান সোবহানের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধার একটি হলো, চীন ও ভারতের প্রতিবেশী হওয়া। আগামী এক দশকে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের উৎপাদন খাত চীন ও ভারতের সরবরাহব্যবস্থারর সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হলেও এ দুই দেশের বিশাল বাজারে রপ্তানির সুযোগ এখনো যথেষ্ট কাজে লাগানো হয়নি।

রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বহুমুখীকরণ নিয়ে অনেক পরিকল্পনা আছে। কিন্তু দুর্বলতা আছে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কৌশলগত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন—দুই ক্ষেত্রেই আরও কার্যকর হতে হবে।

ভৌগোলিক অবস্থান বড় সম্পদ

বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বঙ্গোপসাগরে নয়, দেশের স্থল–ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যেও আছে বলে মনে করেন রেহমান সোবহান।

রেহমান সোবহানের মতে, পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে স্থল যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একসময় বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে বিসিআইএম উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এশিয়ার ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও বলেন রেহমান সোবহান। তিনি মনে করেন, ভারত ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েনই বড় চ্যালেঞ্জ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক থাকলেও সীমান্ত নিয়ে এখনো তাদের বিরোধ আছে। এই দেশ দুটি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে কেন সীমান্ত নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিরিখে বিস্ময়কর বলে মনে করেন তিনি।

রেহমান সোবহানের মতে, ভারত ও চীনের সহযোগিতা বাড়লে এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশও ভূমিকা রাখতে পারে। চীন ও ভারতের বাজার, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে পারে কিংবা সেই সুযোগ নিতে পারে।

রেহমান সোবহানের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য যে এশিয়ার দিকে সরে আসছে, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের জন্য তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই পরিবর্তনর প্রকৃতি বুঝে এশিয়ার সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো।