দেড় বছর আগে ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত করে প্রশাসক বসায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এরপর প্রশাসক বদল হয় তিনবার। প্রথম প্রশাসক ছিলেন আইডিআরএর সাবেক সদস্য সুলতান উল আবেদীন মোল্লা, দ্বিতীয় প্রশাসক সাবেক যুগ্ম সচিব রফিকুল ইসলাম ও বর্তমান প্রশাসক কুদ্দুস খান। এর মধ্যে কুদ্দুস খানের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত।

স্থগিত পর্ষদের পরিচালক জেয়াদ রহমান গত ২০ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে করা এক আবেদনে এই প্রশাসককে প্রত্যাহার করার দাবি জানান। পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে যাতে কোম্পানিটি পরিচালনা করা যায়, সে ব্যাপারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহর সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।

ডেল্টা লাইফের পক্ষে-বিপক্ষে ১৫টি মামলা আছে। এসব মামলা আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার দাবিও জানায় ডেল্টা লাইফ। জানা গেছে, ডেল্টা লাইফের আবেদন ইতিবাচকভাবেই দেখছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। আইনি দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তার অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে তারা। ৪ আগস্ট আদালতে এ ব্যাপারে আরেক দফা শুনানি রয়েছে। এরপর বিষয়টি চূড়ান্ত ফায়সালার দিকে এগোবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো আবেদনে ডেল্টা লাইফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক সময় পার হচ্ছে। দীর্ঘদিন প্রশাসক নিয়োজিত থাকায় কোম্পানির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না। পলিসিহোল্ডারদের সঠিক হারে বোনাস দেওয়া যাচ্ছে না এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন গতকাল রোববার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়েছিল। তবে এ পর্যায়ে মন্তব্য করবেন না তিনি।

দেশের পুরোধা বিমা ব্যক্তিত্ব শাফাত আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ডেল্টা লাইফের জীবন তহবিল আছে চার হাজার কোটি টাকার। কোম্পানির কার্যালয় আছে এক হাজারের বেশি। আর মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ২০ হাজার। ১৯৯৫ সালে এটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হয়। গতকাল ডিসএইতে এর শেয়ার সর্বশেষ কেনাবেচা হয় ১৪৪ টাকা করে। ২০১৮ সালের পর থেকে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এদিকে গত ডিসেম্বর মাসে ডেল্টা লাইফের স্থগিত পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ আনে আইডিআরএ, যা নিয়ে তদন্ত চলছে।

আইডিআরএর নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র এস এম শাকিল আখতার প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আদালত সম্মত হলে নতুন পর্ষদ গঠন করা সম্ভব।

কারা, কী হিসেবে আসছেন

কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ডেল্টা লাইফ নিজেই। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে তারা জানিয়েছে, পলিসিহোল্ডার ও শেয়ারহোল্ডারদের বৃহত্তর স্বার্থে পরিচালনা পর্ষদ ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরও (এমওইউ) করা হয়েছে গত ৪ জুলাই।

এমওইউতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাফিজ আহমেদ মজুমদার এবং হা-মীম গ্রুপের পরিচালক সাকিব আজাদ আসছেন স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে। সাকিব আজাদ হা-মীম গ্রুপের এমডি এ কে আজাদের ছেলে।

আরকম অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির পক্ষে চাকলাদার রেজানুল আলম এবং জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের পক্ষে জুনায়েদ শফিক আসছেন মনোনীত পরিচালক হিসেবে। জুনায়েদ শফিককে কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান করা হচ্ছে।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে এম নূর উদ্দিন খান চেয়ারম্যান হওয়ার আগে ডেল্টা লাইফের চেয়ারম্যান ছিলেন মঞ্জুরুর রহমান। নতুন পর্ষদে তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া রহমান, ছেলে জেয়াদ রহমান, তিন মেয়ে আদিবা রহমান, সায়কা রহমান ও আনিকা রহমান পরিচালক থাকছেন।

আরও থাকছেন সাকিব আজিজ ও আনিসুজ্জামান চৌধুরী নামের দুই ব্যবসায়ী। আনিসুজ্জামান চৌধুরী ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই। আনিসুজ্জামান চৌধুরী নিজে না থেকে পর্ষদে তাঁর এক আত্মীয়কে বসাতে ইচ্ছুক বলে জানা গেছে।

এমওইউতে নূর উদ্দিন খান ছাড়া সবারই স্বাক্ষর আছে। নূর উদ্দিন খান অসুস্থ থাকায় স্বাক্ষর করতে পারেননি বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানিয়েছে ডেল্টা লাইফ।

ডেল্টা লাইফে প্রশাসক নিয়োগের আগে যে পর্ষদ ছিল, তাতে চেয়ারম্যান ছিলেন এম নূর উদ্দিন খান। আর স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল সালাউদ্দিন আহমেদ ও অগ্রণী ব্যাংকের এমডি শামস-উল-ইসলাম। সুরাইয়া রহমান, জেয়াদ রহমান, সায়কা রহমান ও আনিকা রহমান একই পরিবারের সদস্য। এ পর্ষদের সময় কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছিলেন আদিবা রহমান, আইডিআরএ পরে তাঁকে সিইও পদে যোগ দেওয়ার অনুমোদন দেয়নি।

সচিবের কাছে আবেদনকারী জেয়াদ রহমান গত শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, কোম্পানি, শেয়ারহোল্ডার, পলিসিহোল্ডার—সবার স্বার্থেই নিয়মিত পর্ষদ চাচ্ছেন তাঁরা। এর বাইরে তিনি কিছু বলতে রাজি নন।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন