হরমুজ প্রণালির ভেতরে বিএসসির জাহাজ

বাংলাদেশি কনটেইনার জাহাজ
প্রতীকী ছবি

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালির ভেতরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে কার্যত আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) একটি জাহাজ। একই সময় প্রণালির আশপাশের বন্দরগামী অন্তত তিনটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ আরব সাগরে অবস্থান করছে। এ অবস্থায় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরিকল্পনা নিয়েছে বেসরকারি খাতের তিন জাহাজ পরিচালনাকারীরা।

বর্তমানে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ রয়েছে ১০৭টি। এর মধ্যে চারটি জাহাজ এখন মধ্যপ্রাচ্যগামী পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনায় এসব জাহাজে থাকা বাংলাদেশি নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মেরিন বিমা খাতে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্কাইটেক ২৮ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালির ভেতরে বর্তমানে প্রায় ৭৫০টি জাহাজ রয়েছে, যা সম্ভাব্য অবরোধ বা আটকে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।

যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এলাকায় অন্তত চারটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি আরব উপসাগর, ওমান উপসাগর ও উত্তর আরব সাগরে বাড়তি সামরিক তৎপরতার কারণে নাবিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

বিএসসির জাহাজ সতর্ক অবস্থায়

হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থানরত বাংলাদেশের জাহাজটি হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিএসসির এমভি বাংলার জয়যাত্রা। জাহাজটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন।

বিএসসি সূত্রে জানা যায়, ভারত থেকে পণ্য বহন করে ২ ফেব্রুয়ারি পারস্য উপসাগরে যায় জাহাজটি। পরে কাতার থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। ইরানে হামলার পরপরই জাহাজটির কয়েক শ মিটার দূরের একটি তেল ডিপোতে আঘাত হানে ইরান। এরপরই জাহাজটিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয় এবং পণ্য খালাস কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

আমাদের দুটি জাহাজ ওমানের সালালা ও কুয়েতগামী ছিল। এ দুই জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছাতে অন্তত তিন–চার দিন সময় লাগত। তবে ঝুঁকি এড়াতে গতি কমানো হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
—মেহেরুল করিম, নির্বাহী পরিচালক, কেএসআরএম গ্রুপ

জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, জাহাজের সব নাবিক নিরাপদে আছেন। মাস্টারকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং নাবিকদের মনোবল বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাহাজের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে বাংলাদেশি জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান নিহত হন এবং ২৮ নাবিককে পরে উদ্ধার করা হয়।

প্রণালিমুখী আরও তিন জাহাজ

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিন ট্রাফিকের তথ্যে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের বন্দরগামী আরও তিনটি বাংলাদেশি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে কেএসআরএম গ্রুপের দুটি এবং মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) একটি।

কেএসআরএম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মেহেরুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দুটি জাহাজ ওমানের সালালা ও কুয়েতগামী ছিল। এ দুই জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছাতে অন্তত তিন–চার দিন সময় লাগত। তবে ঝুঁকি এড়াতে গতি কমানো হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল শিপিং লাইনসের মহাব্যবস্থাপক মো. আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজা প্রদেশের খোর ফাক্কান বন্দরে বাঙ্কারিং (জাহাজ চালানোর জন্য জ্বালানি তেল নেওয়া) শেষে ডিব্বা বন্দর থেকে পণ্য তোলার পরিকল্পনা ছিল। তবে নাবিকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে যাত্রা স্থগিত করা হয়েছে। জাহাজটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে আরব সাগরে অবস্থান করছে।

মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ছাড়াও লোহিত সাগরে বাংলাদেশের পতাকাবাহী আরও দুটি জাহাজ রয়েছে। তবে জাহাজ দুটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাইরে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাইরে হলেও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এসব জাহাজ থেকেও হরমুজ প্রণালির আশপাশের বন্দরগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ কমছে।

নাবিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার

বাংলাদেশি জাহাজের বড় অংশ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পরিবহন করে। চলমান সংঘাতের কারণে এ অঞ্চলে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশি জাহাজ চলাচলেও তাই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নাবিকদের নিরাপত্তাই প্রথম অগ্রাধিকার। হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত নাবিকদের সঙ্গে সংগঠন থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রধান কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, ‘যুদ্ধ অঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জাহাজ পরিচালনায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিধি মেনে চলার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের জন্য এই নির্দেশনা দিয়েছি আমরা।’