কৃষি খাত
বাড়ছে চাহিদা, তিন বছরে সূর্যমুখীর উৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণ
শর্ষের মতো সূর্যমুখী ভাঙানোর নতুন মেশিনও বাজারে এসে গেছে।
কৃষক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও নতুন উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় অংশই পূরণ হয় সয়াবিন ও পাম তেল দিয়ে। তবে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি প্রক্রিয়াকরণ সহজ হওয়ায় দেশে সূর্যমুখী তেলের চাহিদা ও উৎপাদন—দুটোই বাড়ছে। গত তিন বছরে উৎপাদন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
শর্ষের মতো সূর্যমুখী ভাঙানোর নতুন মেশিনও বাজারে এসে গেছে। ফলে চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি তেল উৎপাদন সহজ হওয়ায় কৃষকেরা এটি চাষে ঝুঁকছেন। বাজার সম্ভাবনা বিবেচনায় ছোট-বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সূর্যমুখী প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে সূর্যমুখী উৎপাদিত হয় ১৫ হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বেড়ে ২৭ হাজার টন ছাড়িয়ে যায়। তবে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অতিবৃষ্টির কারণে উৎপাদন কমে ২২ হাজার টনে নেমে আসে। প্রতি হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর ফলন হয় এক থেকে দেড় টন।
বাজার ও দরদাম
ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, দেশে বছরে কমবেশি ১৫০ কোটি টাকার সূর্যমুখী তেল বিক্রি হয়। বছরে ৫ শতাংশ হারে বাজার বাড়ছে। বাজারে দেশি–বিদেশি কয়েকটি ব্র্যান্ডের সূর্যমুখী তেল পাওয়া যায়। সাধারণত পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে তেলের চাহিদা বাড়ায় সূর্যমুখীর উৎপাদন বাড়ছে। সূর্যমুখী ভাঙানোর নতুন মেশিন আসায় তেল তৈরির কাজও সহজ হয়েছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দেখা যায়, ইউক্রেন থেকে আমদানি করা জাদে নামের সূর্যমুখী তেলের পাঁচ লিটারের টিনের বোতল ১ হাজার ৯০০ ও তুর্কি ব্র্যান্ড কিংস তেলের পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশি কোম্পানি ইসি অর্গানিকের তেল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। আবার আমদানি করা গোল্ডেন ড্রপ ব্র্যান্ডের পাঁচ লিটার তেল বিক্রি হয় ২ হাজার ১০০ টাকায়। রাঁধুনীর সূর্যমুখী তেল পাঁচ লিটার বিক্রি হয় ২ হাজার ৩৫০ টাকায়। এসিআইয়ের পাঁচ লিটার লে ব্ল্যাঙ্ক সূর্যমুখী তেল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৭৫ টাকায়।
সুপারশপে অবশ্য বাজারের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। যেমন, ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি সুপারশপ ৫ লিটার ইসি অর্গানিক ব্র্যান্ডের তেল ২ হাজার ২৫০ টাকায় এবং ব্ল্যাঙ্কসি ২ হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি করছে।
তেল ব্যবসায় কারা
২০২৩ সালের শেষ দিকে সূর্যমুখী তেল নিয়ে বাজারে আসে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের (ইসিজি) সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইসি অর্গানিক প্রোডাক্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার আশুলিয়ায় কারখানা স্থাপন করেছে।
ইসি অর্গানিক প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভির চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, স্থানীয় উৎপাদন কম হওয়ায় দেশি বীজের পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভর করেই বাজার চালাতে হচ্ছে। তাঁদের প্রতিষ্ঠান মাসে প্রায় ১০০ টন তেল বিক্রি করছে। তাঁরা এখন পাইলট ভিত্তিতে সূর্যমুখী তেল শোধনাগার (রিফাইনারি) স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন।
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নের কৃষক জেসমিন বেগম সরকারি প্রকল্পের আওতায় পাওয়া মেশিনে দেশি বীজ ভেঙে তেল উৎপাদন করেন। ৪০ কেজি বীজ থেকে ১৬ কেজি তেল পান। প্রতি কেজি তেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন।
অন্যদিকে এসিআই এডিবল অয়েলস মাসে প্রায় ৪০ টন সূর্যমুখী তেল বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব শোধনাগার না থাকায় ইউক্রেন থেকে তেল আমদানি করে বাজারজাত করা হয়।
এসিআই ফুডের ব্যবসায় ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলাম জানান, চাহিদা বাড়লে ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের চিন্তা করবে তাঁদের প্রতিষ্ঠানটি।
উৎপাদন বাড়ছে যেভাবে
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সমাজে স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন বড় ও ছোট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী তেল উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। এতেও আবার চাহিদা বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পও ভূমিকা রাখছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ২৫০টি উপজেলায় তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পটির পরিচালক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, আগে সূর্যমুখী প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকায় চাষ কম ছিল। এখন বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে। কৃষকেরাও বেশি বীজ চাইছেন। নতুন উদ্যোক্তারাও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সব মিলিয়ে চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ছে।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় উপকূলীয় এলাকায় ৬৫০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে চাষিদের বীজ ও সারসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া তেল ভাঙানোর জন্য ৩০০টি মেশিন দেওয়া হয়েছে এবং চলতি বছর আরও ৩২০টি দেওয়া হবে। প্রতিটি মেশিনের দাম আড়াই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা।
উৎপাদন বেশি উপকূলে
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সূর্যমুখীগাছ লবণাক্ততা সহনশীল হওয়ায় উপকূলীয় এলাকার পতিত জমিতে এর চাষ বাড়ছে। লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরাও এ ফসলে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে নোয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর এলাকায় সূর্যমুখীর চাষ বেশি হচ্ছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরগুনা জেলায় সর্বোচ্চ ৯১৫ টন ও পিরোজপুরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭১৩ টন সূর্যমুখী বীজ উৎপাদন হয়। এ ছাড়া বাগেরহাটে ৩৪৫ টন, নোয়াখালীতে ২৪৮ টন ও ঝালকাঠিতে ২৩১ টন উৎপাদন হয়েছে।
চাষে কতটা লাভ
কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রতি কেজি বীজের দাম প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতি বিঘায় লাগে প্রায় ৪০০ গ্রাম বীজ, যার দাম পড়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা। সেই সঙ্গে নিজেদের শ্রম বাদে সার ও সেচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় খরচ হয় আরও ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা, অর্থাৎ বিঘায় খরচ হয় সাড়ে ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের (ইউএসডিএ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩২ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদার ৫০ শতাংশ পাম তেল, ২৮ শতাংশ সয়াবিন তেল, ১৯ শতাংশ শর্ষে তেল এবং বাকি ৩ শতাংশ চাহিদা সূর্যমুখীসহ অন্য তেলে পূরণ হয়।