জয়পুরহাটের যে বাজারে নেপিয়ার ঘাসের দিনে বেচাকেনা ৫০ হাজার টাকা
বাজার শেষে ভ্যানে উঠেছিলেন গৃহিণী শাহনাজ বেগম। হঠাৎ রাস্তার পাশে সবুজ নেপিয়ার হাইব্রিড ঘাসের আঁটি দেখে নেমে পড়লেন। গরু আছে বাড়িতে—দুই আঁটি ঘাস না কিনলে চলে না।
শাহনাজ বেগমের মতো এমন অনেকেই প্রতিদিন জয়পুরহাটের আক্কেলপুর কলেজ বাজার এলাকায় প্রধান সড়কের পাশ থেকে গবাদিপশুর খাবার হিসেবে নেপিয়ার ঘাস কিনছেন। এই ঘাসের আঁটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক ব্যস্ত বাজার। প্রতিদিন এখানে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার আঁটি নেপিয়ার হাইব্রিড ঘাস। এতে প্রতিদিনের অর্ধলাখ টাকার বেশি লেনদেন ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এই ছোট্ট ঘাসের বাজার এখন কৃষক, বিক্রেতা আর গৃহস্থ—তিন পক্ষেরই জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। সবুজ নেপিয়ার হাইব্রিড ঘাসের এই আঁটিগুলো এখন শুধু পশুখাদ্য নয়, আক্কেলপুরের অনেক মানুষের জীবিকার আশ্রয়ও হয়ে উঠেছে।
গত বুধবার সকালে কলেজ বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীরঘেঁষা প্রধান সড়কের পাশে সারি সারি নেপিয়ার ঘাস সাজিয়ে বসেছেন ১০ থেকে ১২ জন বিক্রেতা। পুরুষদের পাশাপাশি গৃহবধূরাও ভিড় করছেন। খুচরা প্রতিটি আঁটি ঘাস বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়, আর পাইকারিতে ২৮ টাকায়।
ক্রেতা-বিক্রেতারা কী বলেন
ঘাস বিক্রেতারা জানান, প্রায় ৭–৮ বছর আগে এখানে নেপিয়ার ঘাস বিক্রি শুরু হয়। তখন আমদানি ও ক্রেতা—দুটিই ছিল কম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবাদিপশু পালন বাড়ায় ঘাসের চাহিদাও বেড়েছে।
এখন প্রতিদিনই ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত জমে ওঠে কেনাবেচা। তবে এই জমজমাট বাজারের মধ্যেও আছে ভোগান্তি। নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় রাস্তার পাশেই বসতে হয় বিক্রেতাদের। এতে যান চলাচলের ঝুঁকি যেমন থাকে, তেমনি পৌরসভা ও প্রশাসনের বাধার মুখেও পড়তে হয়।
ঘাস বিক্রেতা কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা এখানে ১০ জন ব্যবসায়ী। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার আঁটি ঘাস বিক্রি হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় সমস্যায় পড়ি। ঘাসের আবর্জনাও আমাদেরই পরিষ্কার করতে হয়, অথচ নিয়মিত হাটের হাসিল দিচ্ছি।’
গৃহস্থ বাবলু হোসেনের বলেন, ‘এক দিন পরপর আমাকে ঘাস কিনতে হয়। বাজারে সহজে ঘাস পাওয়া যায়, তাই গরুর খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা কমেছে।’
গৃহবধূ শাহনাজ বেগম বলেন, ‘আমার বাড়ি পাশের বদলগাছি উপজেলার কেশাইল গ্রামে। আমি বাজার করতে এসে গরুর জন্য ৭০ টাকায় দুই আঁটি ঘাস কিনলাম।’
৩০ হেক্টর জমিতে চাষ
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর আক্কেলপুর উপজেলায় ৩০ হেক্টর জমিতে নেপিয়ার হাইব্রিড ঘাস চাষ হয়েছে। চলতি বছর সেই পরিমাণ আরও বেড়েছে। এক বিঘা জমিতে ঘাস চাষে খরচ হয় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। এক বছরে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হয়।
শ্রীকৃষ্টপুর মহল্লার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নেপিয়ার হাইব্রিড ঘাসে ঝুঁকি কম আবার লাভ নিশ্চিত। তাই গবাদিপশু থাকলে ঘাসের চাহিদা কখনো কমে না। এ কারণে প্রায় চার বছর ধরে ঘাস চাষ করছি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, ‘নেপিয়ার হাইব্রিড ঘাস গবাদিপশুর জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য। ঘাস আবাদে ঝুঁকি ও খরচ কম, আবার লাভও বেশি হচ্ছে। এ কারণে কৃষকদের দিন দিন নেপিয়ার হাইব্রিড ঘাস চাষে আগ্রহ বাড়ছে। আমরা কৃষকদের ঘাস চাষে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি।’
নেপিয়ার ঘাস কেন
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, নেপিয়ার হাইব্রিড ঘাসে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে। এই ঘাস পশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও মাংস বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। সুস্থ-সবল পশু পালনে সবুজ ঘাসের কোনো বিকল্প নেই। এলাকার অনেক কৃষক এবং খামারি এখন নেপিয়ার ঘাস চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এই ঘাসের উপকারিতা জেনে তাঁদের দেখে অন্যরাও চাষ করছেন। গরুর খাবারের চাহিদা পূরণে এই ঘাস অনেক উপকারী।