আজ বুধবার বেলা ১১টায় শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা ফিশারীঘাটের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, গভীর সমুদ্র থেকে ইলিশ ধরে ঘাটে ভিড়েছে ৩০টির বেশি ট্রলার। প্রতিটি ট্রলারে কমবেশি ইলিশ ছিল। পাশাপাশি ছিল সামুদ্রিক মাছ গুইজ্যা, মাইট্যা, রূপচাঁদা, চাপা, রাঙাচকি, কামিলা, পোপা মাছও।

এফবি তরঙ্গ নামের একটি ট্রলারে থাকা আড়াই হাজার ইলিশ বিক্রি করে পেয়েছেন ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ট্রলারটির মালিক শহরের ৬ নম্বর ঘাট এলাকার মাহমুদুল করিম বলেন, প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৮৫০ টাকায়, যা কয়েক দিন আগেও বিক্রি হয়েছিল প্রতি কেজি ১ হাজার টাকায়। ইলিশ বেশি ধরা পড়ছে বলে দামও কমেছে।

এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলেরা বড় আকৃতির ১ হাজার ৫০০টি ইলিশ বিক্রি করে পেয়েছেন ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ট্রলারের মালিক শামসুল আলী বলেন, ৭০-৯০ কিলোমিটার দূরে গভীর সাগরে জাল ফেললে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ধরা পড়ছে। কিন্তু এত দূর যাওয়ার সক্ষমতা বহু ট্রলারের নেই।

শহরের নতুন ফিশারীঘাট এলাকার আমির হোসেনের মালিকানাধীন এফবি সেলিম ট্রলারের জেলেরা ৩ হাজার ৫০০টি ইলিশ বিক্রি করেছেন ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। তাতে মন খারাপ জেলেদের। ট্রলারে জেলে ছিলেন ১৯ জন। ট্রলারের মাঝি জানান, প্রতিটি ইলিশের ওজন ৩৫০-৫০০ গ্রাম। তাই দামও কম পেয়েছেন তাঁরা। জেলেরা বলেন, ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরের সাগরে জাল ফেললে যেসব ইলিশ ধরা পড়ছে, তার ওজন ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম।

আজ দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ফিশারীঘাটের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৬১ মেট্রিক টন ইলিশ। মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বিক্রি হওয়া ইলিশের ৭০ শতাংশের ওজন ৬০০ থেকে ৯০০ গ্রাম। আর ১৫ শতাংশ ইলিশের ওজন ৯০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ গ্রাম। অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ ইলিশের ওজন ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম।

ব্যবসায়ীরা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে ইলিশ কিনে প্রথমে বরফ দিয়ে কার্টন ভর্তি করেন। তারপর ট্রাক বোঝাই করে সরবরাহ দিচ্ছেন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। ইলিশ সরবরাহ করছেন ফিশারীঘাট মৎস্য ঐক্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ৭০-৯০ জন সদস্য। সমিতির সদস্যসংখ্যা ৭৫০ জন।

সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ইলিশ রপ্তানিকারক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ২৮ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে জেলেরা ইলিশ ধরতে সাগরে নামেন। প্রথম এক সপ্তাহ জেলেদের জালে ধরা পড়েছিল ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ। এখন ধরা পড়ছে ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ গ্রাম ওজনের বড় ইলিশ।  

জয়নাল আবেদীন বলেন, আজ বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সাতটি ট্রাকে প্রায় ৫ মেট্রিক টন ইলিশ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সরবরাহ করা হয়েছিল ৮টি ট্রাকে প্রায় ৪২ মেট্রিক টন ইলিশ।  

সরেজমিনে দেখা যায়, ফিশারীঘাটে ৩৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা কেজিতে, ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৮৫০ টাকায় এবং এক গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। জেলেদের অভিযোগ, ইলিশ ধরা পড়ছে দেখে ব্যবসায়ীরা ইলিশের দাম কমিয়ে দিয়েছেন।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. বদরুদ্দৌজা প্রথম আলোকে বলেন, আজ বুধবার সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে বেচাবিক্রি হয়েছে ৬৫ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ। এর মধ্যে ইলিশ ছিল ৬০ মেট্রিক টন।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর থেকে এই কেন্দ্রে ইলিশের বেচাবিক্রি শুরু হয়। আজ বুধবার পর্যন্ত ১১ দিনে বেচাবিক্রি হয়েছে ৩৬৫ মেট্রিক টন ইলিশ। পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ গুইজ্যা, মাইট্যা, রূপচাঁদা, চাপা, রাঙাচকি, কামিলা, পোপা, লইট্যা বেচাবিক্রি হয়েছে ৯৫ মেট্রিক টনের বেশি।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. বদরুদ্দৌজা বলেন, সরকারি আইন পুরোপুরি মেনে চলায় এবার সাগরে ইলিশের প্রজনন আগের তুলনায় বেড়েছে অনেক। সাগরে ইলিশের প্রজনন বেড়েছে দ্বিগুণ। এখন সাগরে জাল ফেললে ধরা পড়ছে ইলিশ।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী,গত অর্থবছরে জেলায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৪০ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন।

এবার লক্ষ্যমাত্রার বেশি ইলিশ আহরণ হবে জানিয়ে কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, ইলিশ ধরতে সাগরে অবস্থান করছেন জেলার টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া ও পেকুয়ার প্রায় ৬ হাজার ট্রলারের ১ লাখ ৩০ হাজার জেলে। প্রতিটি ট্রলার কমবেশি ১ হাজার থেকে ৫ হাজার ইলিশ ধরে ঘাটে ফিরছে।