ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে না। গত আগস্টে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৩২ শতাংশের বেশি। অর্থনীতির এই চিত্রের পাশাপাশি রাজস্ব আদায় ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও ঘাটতি রয়েছে।
আজ সোমবার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সেপ্টেম্বর মাসের ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এ সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
কমেছে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি
জিইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গত বছরের আগস্টে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ০১ শতাংশ।
অন্যদিকে আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমেছে। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ এক বছরে বেড়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হারে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
রাজস্বে ঘাটতি
রাজস্ব আদায়েও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বড় ব্যবধান রয়েছে। আগস্টে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। ফলে এক মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে জুলাই-আগস্টে মোট ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায়ের হার ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
তবে আগের বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ আদায় বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর।
এডিপি বাস্তবায়নের হার কমেছে
রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে এডিপিতে খরচ হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম দুই মাসে এডিপি ব্যয় সামান্য কমেছে। এ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
রেমিট্যান্স বাড়লেও কমেছে রপ্তানি আয়
বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতির গণনায় রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
তবে রপ্তানি আয়ে ছিল উল্টো চিত্র। আগস্টে মোট রপ্তানি আয় আগের মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪৪২ কোটি ৯৪ লাখ ডলারে নেমেছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম মজুরি বৃদ্ধি
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ রয়েছে। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে।
ফলে আগস্টে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে শূন্য দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক আমানত ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উন্নতি দেখা গেলেও বেসরকারি ঋণপ্রবাহ, রাজস্ব আদায় ও উন্নয়ন ব্যয়ের সূচকে দুর্বলতা রয়েছে।