আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক শুরু, বাড়তি সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে চলমান ঋণের কিস্তি পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ সরকার। এর বাইরে নতুন ঋণও চায়। বিনিময়ে আইএমএফের শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করবে বাংলাদেশ, যার মধ্যে অন্যতম একক ভ্যাটহার চালু করা। সংশোধন করে হলেও ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন পাস করায় আপাতত মুখরক্ষা হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইএমএফকে তা বলতে পারবেন। তবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ বাতিল করায় এ–বিষয়ক আইন করার নতুন প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। পাশাপাশি রাজস্ব খাতের সংস্কারের পরিকল্পনাও আইএমএফকে জানাতে হবে।
অর্থনীতির বিদ্যমান বাস্তবতা, আসন্ন বাজেট, যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা—এসব কারণে বাজেট–সহায়তা হিসেবে অন্তত ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশের। আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ইত্যাদি সংস্থা থেকেও অর্থ পাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করবে বাংলাদেশ দল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে গতকাল সোমবার শুরু হয়েছে। বৈঠক চলবে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত। এতে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ১৪ সদস্যের একটি দল অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ১১ জন গেছেন বাংলাদেশ থেকে। আর তিনজন যোগ দিয়েছেন ওয়াশিংটন থেকে।
দলের অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাসান খালেদ ফয়সাল, ইআরডির অতিরিক্ত সচিব মিরানা মাহরুখ, যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ রেজাউল করিম ও উপসচিব সেলিনা কাজী এবং অর্থমন্ত্রীর একান্ত সচিব আসিফ ইকবাল। এ বৈঠকে ওয়াশিংটন ডিসি থেকে যোগ দিয়েছেন ওয়াশিংটন ডিসিতে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক শরিফা খান, রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম এবং ইকোনমিক মিনিস্টার মো. ফজলে রাব্বি।
সূত্রগুলো জানায়, এ বৈঠকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করবে বাংলাদেশ।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরসহ নীতিনির্ধারকেরা মিলিত হবেন। বৈঠকে অংশ নিতে দেশ ছাড়ার আগে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী প্রথম আলোকে জানিয়েছে, দেশের অর্থনীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হবে।
অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রের মধ্যে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৭২ হাজার কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে, যা ৬ শতাংশের মতো। প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ভালো থাকলেও গত ৮ মাসের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। মার্চ মাসে ৩৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। তবে পণ্য রপ্তানি কমেছে ২০ শতাংশ।
কিস্তি মিলতে পারে জুলাইয়ে
চলমান ৫৫০ কোটি টাকার ঋণ কর্মসূচি থেকে ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড় পাওয়া ও কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের দেওয়া শর্ত কিছুটা নমনীয় করার আলোচনাও বৈঠকে হবে বলে জানা গেছে। আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। মাঝখানে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার।
ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার পাওয়ার কথা ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। তা পাওয়া যায়নি। আগামী জুনে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা জুলাই পর্যন্ত গড়াতে পারে। কারণ, আইএমএফের এবারের মিশন আসবে মে মাসে। ফলে আইএমএফের জুনের পর্ষদে কিস্তিছাড়ের প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার সুযোগ কম, যার অন্যতম কারণ হচ্ছে মিশনের প্রতিবেদনটি এর মধ্যে শেষ না-ও হতে পারে। জানা গেছে, জুলাইয়েও সংস্থাটির পর্ষদ বৈঠক রয়েছে। সেই বৈঠকে যাতে কিস্তিছাড়ের প্রস্তাব ওঠে, তা আশা করবে বাংলাদেশ।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী এ সময় আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক করবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে গত ২৪ মার্চ ঢাকায় এসে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন যে বৈঠক করে গেছেন, তাঁর সঙ্গে ওয়াশিংটনেও বৈঠক করবেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এ বৈঠকে আইএমএফের কাছে অতিরিক্ত প্রায় ২০০ কোটি ডলার সহায়তা চাইতে পারে বাংলাদেশ। বৈঠকে চলমান ঋণ কর্মসূচির বাকি অর্থছাড়ের পাশাপাশি শর্ত কিছুটা শিথিল করার আলোচনাও হবে। তবে আইএমএফের নজর মূলত দুটি খাতে—রাজস্ব ও ব্যাংক খাতের সংস্কার। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ভ্যাট কাঠামো একক করা এবং ব্যাংক খাতে সংস্কারের অগ্রগতি না হলে বাড়তি ঋণ তো দূরের কথা, চলমান কর্মসূচি থেকে কিস্তিছাড়ই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
একক ভ্যাটহার চালুর সম্ভাবনা
রাজস্ব খাত ও ব্যাংক খাতের সংস্কারে আইএমএফের ভালো নজর রয়েছে বলে জানায় অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো। ঋণ অনুমোদনের পর ২০২৩ সালেই আইএমএফ শর্ত দিয়েছিল যে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায় প্রতিবছর দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ তা পারেনি। তার ওপর ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হার চায় আইএমএফ। বর্তমানে এ হার আছে ৫, ৭ দশমিক ৫, ১০ এবং ১৫ শতাংশ। সংস্থাটি ২ শতাংশ টার্নওভার করও আরোপ চায়। তবে ভ্যাটের একক হারের বিষয়ে নীতিগতভাবে বাংলাদেশ রাজি বলে জানা গেছে। অবশ্য টার্নওভার করের ব্যাপারে বাংলাদেশ একমত নয়।
জানতে চাইলে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, নতুন সরকারের নানা প্রতিশ্রুতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটে হঠাৎ বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এ কারণে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের এবারের বৈঠকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থ দরকার, কিন্তু দেশীয় উৎস থেকে তা সংগ্রহের ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। ফলে ভরসা হচ্ছে আইএমএফসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো। তবে আইএমএফের মূল্যায়ন প্রতিবেদন নেতিবাচক হলে অন্যরা ঋণ দিতে নেতিবাচক হয়ে যায়।
সেলিম রায়হান আরও বলেন, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের কাজটি অন্তর্বর্তী সরকার সুসংহতভাবে করতে পারেনি। বর্তমান সরকার কী করছে, তা–ও স্পষ্ট নয়। তবে সংস্কারের বিকল্প নেই। এবারের বৈঠকে আইএমএফের সঙ্গে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে দর-কষাকষি করবে, তার ওপর নির্ভর করবে উন্নয়ন সহযোগীদের থেকে বাড়তি অর্থসহায়তা মিলবে কতটুকু।