প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে মানুষের চলাচলের ধরনও পাল্টে গেছে। একসময় মানুষ পালতোলা জাহাজে করে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পাড়ি জমাত। কিন্তু সেই দিনের অবসান হয়েছে অনেক আগেই।
মানুষ এখন উড়োজাহাজে করে এক মহাদেশ বা দেশ, এমনকি দেশের ভেতরে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যাচ্ছে। ফলে বিমান কোম্পানিগুলোরও বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। বিশ্বের বিমান কোম্পানিগুলো এখন হাজার হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা করছে। দেখে নেওযা যাক, আয়ের দিক থেকে বিশ্বের বৃহৎ ১০টি বিমান কোম্পানি কোনগুলো:
চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস (এমইউ), শাংহাইভিত্তিক, চীনের ‘বিগ থ্রি’ এয়ারলাইনের মধ্যে অন্যতম। এটি স্কাইটিম জোটের সদস্য। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই এয়ারলাইনসের বহরে ৮০০টির বেশি উড়োজাহাজ আছে। এশিয়ায় সবচেয়ে নতুন বহর, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় সি৯১৯ অন্তর্ভুক্ত। শাংহাই পুডং ও হংকিয়াও, বেইজিং দাসিং, শিয়ান ও কুনমিংকে কেন্দ্র করে উড়ান পরিচালনা করে এই কোম্পানি। ৪০টি দেশ ও অঞ্চলের ২৫৫টি গন্তব্যে প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০টির বেশি উড়ান পরিচালনা করে।
এয়ার চায়না লিমিটেড (সিএ) চীনের জাতীয় বিমান সংস্থা। বেইজিংভিত্তিক এই কোম্পানি ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। বেইজিং ক্যাপিটাল ও চেংদু তিয়ানফু থেকে ৪০০টির বেশি উড়োজাহাজে ৪০টির বেশি দেশের ২০০টিরও বেশি গন্তব্যে সেবা দেয়। স্টার অ্যালায়েন্সের শীর্ষ চীনা সদস্য হিসেবে এটি প্রতি সপ্তাহে ছয়টি মহাদেশে তিন হাজারের বেশি উড়ান পরিচালনা করে, বিশেষত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দিকে মনোযোগী। ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বহর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে জোর দিচ্ছে তারা।
১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৭১ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস কোম্পানি (এনওয়াইএসই: এলইউভি) যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ এয়ারলাইনস। তারা মূলত স্বল্পমূল্যে যাত্রীসেবা দেয়। এই কোম্পানির সদর দপ্তর টেক্সাসের ডালাসে। শুধু বোয়িং ৭৩৭ মডেলের ৮১০টি উড়োজাহাজ নিয়ে গঠিত তাদের বহর। যুক্তরাষ্ট্রের ৪২টি অঙ্গরাজ্য, পুয়ের্তো রিকো, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ১০০টির বেশি গন্তব্যে সেবা দেয় সাউথওয়েস্ট। ২০২৪ সালে তারা ১৪ কোটি যাত্রী পরিবহন করেছে। এই সময় তাদের নিট মুনাফা হয়েছে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সম্প্রতি তারা কিছু নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে আছে ২০২৬ সাল থেকে নির্দিষ্ট আসনব্যবস্থা চালু, বিনা মূল্যের চেকড ব্যাগ সুবিধা বাতিল, প্রিমিয়াম সেবা চালু ও আইসল্যান্ড এয়ারসহ অন্যান্য এয়ারলাইনসের সঙ্গে ইন্টারলাইন চুক্তি।
চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনস (সিজেড) বহরের দিক থেকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনস। ১৯৮৮ সালে গঠিত এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর চীনের গুয়াংজুতে। গুয়াংজু বাইইউন ও বেইজিং দাসিংকে কেন্দ্র করে ৯০০টির বেশি উড়োজাহাজে তারা বিশ্বের ৪০টি দেশের ২০০টির বেশি গন্তব্যে সেবা দেয়। প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি উড়ান পরিচালনা করে এই এয়ারলাইনস। যদিও তাদের মূল লক্ষ্য চীনের অভ্যন্তরীণ গন্তব্য, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে শিয়ামেন এয়ারলাইনস। ২০১৯ সালে স্কাইটিম জোট ছাড়ার পর তারা আমেরিকান এয়ারলাইনসের সঙ্গে অংশীদারি গড়ে তুলেছে। নিরাপত্তা, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগকে কেন্দ্র করে পরিচালন কেন্দ্র সম্প্রসারণ ও টেকসই বিমান চলাচল লক্ষ্যমাত্রা—এই তিন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছে চায়না সাউদার্ন।
এয়ার ফ্রান্স–কেএলএম গ্রুপ ২০০৪ সালে এয়ার ফ্রান্স ও কেএলএম রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনসের একীভবনের মাধ্যমে গঠিত ফরাসি–ডাচ এয়ারলাইনস হোল্ডিং কোম্পানি। প্যারিস–শার্ল দ্য গল, অর্লি ও আমস্টারডাম স্কিফোলকে কেন্দ্র করে ৫৬৪টি উড়োজাহাজে ৯০টির বেশি দেশের ৩২০টির বেশি গন্তব্যে তারা সেবা দেয়। গ্রুপের ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে এয়ার ফ্রান্স, কেএলএম, ট্রান্সাভিয়া ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস, হপ ও কেএলএম সিটিহপার—সবই স্কাইটিম জোটের সদস্য। যাত্রী পরিবহন থেকেই মূল রাজস্ব আসে। ২০২৬ সালেট্যাপ এয়ার পর্তুগালের অংশীদারত্ব নিতে চায় তারা। এর মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে কোম্পানিটি।
ইন্টারন্যাশনাল কনসলিডেটেড এয়ারলাইনস গ্রুপ এসএ (আইএজি) ব্রিটিশ–স্প্যানিশ বহুজাতিক এয়ারলাইনস গোষ্ঠী। ২০১১ সালে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও ইবেরিয়ার একীভবনের মাধ্যমে এটি গঠিত হয়। গোষ্ঠীর মালিকানায় আছে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইবেরিয়া, এয়ারলিংগাস, ভুয়েলিং ও লেভেল। ৬০০টির বেশি উড়োজাহাজ নিয়ে ৯১টি দেশের ২৬০টির বেশি গন্তব্যে তারা সেবা দেয়। বছরে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ যাত্রী পরিবহন করছে তারা। লন্ডনে সদর দপ্তর এবং মাদ্রিদে নিবন্ধিত আইএজির আয়ের ৮৮ শতাংশ আসে যাত্রী পরিবহন থেকে; পাশাপাশি আইএজি কার্গো সেবাও দেয়। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ (আইএজি) ও মাদ্রিদ স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএমএডি: আইএজি) তালিকাভুক্ত এই গ্রুপ এফটিএসই ১০০ ও আইবেক্স ৩৫ সূচকের অন্তর্ভুক্ত। কাতার এয়ারওয়েজে তাদের মালিকানা আছে ২৫ দশমিক ১ শতাংশ।
জার্মানির কোলনভিত্তিক ডয়চে লুফথানসা এজি ইউরোপের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনস গ্রুপ। ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখকে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে এই এয়ারলাইনস। ২০২৬ সালে শতবর্ষ উদ্যাপন করবে এই গোষ্ঠী। ১০০টি দেশের ৩৩০টির বেশি গন্তব্যে উড়ান পরিচালনা করে তারা। বহর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ২০৩২ সালের মধ্যে ২৩০টির বেশি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করবে তারা। ২০২৬ সালে দীর্ঘপাল্লার সক্ষমতা ৬ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে লুফথানসা। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে কোম্পানিটি ১০ কোটি ৩০ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ওর্থভিত্তিক আমেরিকান এয়ারলাইনস গ্রুপ (এএএল) বছরে প্রায় ২১ কোটি ৫০ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। ফলে যাত্রীসংখ্যার হিসাবে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনস। প্রতিদিন ৬ হাজার ৮০০টি উড়ানে ৫০টি দেশের ৩৫০টির বেশি গন্তব্যে সেবা দেয় তারা। ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়ানওয়ার্ল্ড জোটের সদস্য এ এয়ারলাইনসের বহরে রয়েছে ৯৮৭টি উড়োজাহাজ। সিইও রবার্ট আইসমের নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ সজ্জায় পরিবর্তন এবং এ৩২১নিও ও বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স যুক্ত করে বহর আধুনিকায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কোম্পানির ঋণের পরিমাণ কমিয়ে ২৯ বিলিয়ন ডলারে নামানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগোভিত্তিক ইউনাইটেড এয়ারলাইনস হোল্ডিংস ইনকরপোরেটেড (ইউএএল) হলো ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের মূল কোম্পানি। ১ হাজার ৫৮টি উড়োজাহাজ নিয়ে বহরের আকারের দিক থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনস। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো, ডেনভার, হিউস্টন, লস অ্যাঞ্জেলেস (এলএএক্স), নিউইয়র্ক, সান ফ্রান্সিসকো ও ওয়াশিংটন ডিসিকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে ৬ মহাদেশে ৩৫০টির বেশি গন্তব্যে সেবা দেয় এই কোম্পানি। সিইও স্কট কার্বির নেতৃত্বে ২০২৬ সালে ১০০টির বেশি নতুন সরু আকৃতির উড়োজাহাজ ও ২০টি বোয়িং ৭৮৭ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে তাদের। উন্নত মানের সেবা এবং এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে ইউনাইটেড।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টাভিত্তিক ডেলটা এয়ারলাইনস রাজস্ব আয়ের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম বিমান সংস্থা। এই বিমান সংস্থা ৯টি কেন্দ্রের ভিত্তিতে (সবচেয়ে বড় হার্টসফিল্ড-জ্যাকসন আটলান্টা) প্রতিদিন ৫ হাজার ৪০০টির বেশি উড়ান পরিচালনা করে। ৫২টি দেশের ৩২৫টি বিমানবন্দরে যাত্রীদের পৌঁছে দেয় এই বিমান সংস্থা। ১৯২৮ সালে (তখন নাম ছিল হাফ ডাল্যান্ড ডাস্টার্স) প্রতিষ্ঠিত এয়ারলাইনসে এক লাখ মানুষ কর্মরত। তাঁদের বহরে এয়ারবাস ও বোয়িং—উভয় কোম্পানিরই বিমান আছে। সম্প্রতি নিজেদের বহরে এয়ারবাসের এ৩৫০-১০০০ ও বোয়িং ৭৮৭-১০ যুক্ত করে ৯৮৯ উড়োজাহাজের বহর আধুনিকায়ন করছে তারা।