১৫ বছরে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতায় খরচ বেড়েছে ৪ গুণ
আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। বিদ্যমান মূল বেতন থেকে নবম পে কমিশনের সুপারিশ করা মূল বেতনের বাড়তি অংশের ৫০ শতাংশ দেওয়া হবে। এটি প্রথম ধাপের বেতন বৃদ্ধি। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ জন্য বাড়তি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বাবদ প্রতিবছর বাজেটে বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখতে হয়। প্রতিবছরই এই বরাদ্দ বাড়াতে হয়।
বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। এ ছাড়া ৯ লাখ পেনশনভোগী সরকারি পেনশন সুবিধা পান। বর্তমান বেতনকাঠামো অনুসারে, মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব বোনাস, বৈশাখী ভাতা—এসব পান। বেতনের প্রায় সমপরিমাণ অর্থ এসব ভাতায় বরাদ্দ রাখতে হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ বছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতায় বরাদ্দ প্রায় চার গুণ বেড়েছে। আরও সহজভাবে বলা যায়, দেড় দশকে বেতন–ভাতায় বরাদ্দ ২৭৫ শতাংশ বেড়েছে। আগামী অর্থবছরে তা চার গুণের বেশি বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে।
এর মানে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতায় সরকারের খরচ দিন দিন বাড়ছে। এতে চাপ পড়ছে বাজেটের অর্থ ব্যবস্থাপনায়। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে সরকার উভয় সংকটে আছে। একদিকে বেতন বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে বেতন বাড়ানো হলে বাজেটের অর্থ ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সেই চাপও আছে। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুপারিশ অনুসারে বেতন বাড়ানো হলে তা স্থায়ীভাবে বেড়ে যায়। তখন সরকারকে বাড়তি অর্থ জোগান দিতে শুধু এক অর্থবছরের কথা চিন্তা করলেই হয় না। পরবর্তী অর্থবছরের কথাও ভাবতে হয়।
প্রতিবছর সরকার বাজেটের মাধ্যমে যত টাকা খরচ করে, এর মধ্যে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় আছে। উন্নয়ন খরচ মূলত প্রকল্পের মাধ্যমে হয়। এই খরচ বাজেটের এক-চতুর্থাংশের মতো। বাকি খরচ সরকারের পরিচালন খরচ। এতে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ বরাদ্দের পর সবচেয়ে বরাদ্দ রাখা হয় বেতন–ভাতায়। এর মানে হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতা এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচের খাত।
সরকার প্রতিবছর বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন–ভাতার জন্য আলাদাভাবে বরাদ্দ দেয়। বেতন অংশে থাকে মূল বেতন। আর ভাতা অংশে থাকে বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ অন্যান্য ভাতা।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে সরকার উভয় সংকটে আছে। একদিকে বেতন বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে বেতন বাড়ানো হলে বাজেটের অর্থ ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে—সেই চাপও আছে: জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট দলিল অনুসারে, ২০১১-২২ অর্থবছরে বেতন–ভাতায় বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। এরপর প্রতিবছরই এই খাতে বরাদ্দ বাড়ে। ৫ বছর পর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ৭৫ হাজার কোটি টাকা পার হয়।
সবশেষ চলতি অর্থবছরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতায় ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এমন অবস্থায় নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হলে আগামী অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
নতুন বেতনকাঠামো কি হচ্ছে
১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশই আমলে নিচ্ছে বর্তমান সরকার।
কমিটির সুপারিশ হচ্ছে—তিন অর্থবছরে তিন ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা; প্রথম দুই অর্থবছরে দেওয়া হবে ৫০ শতাংশ করে মূল বেতন; আর তৃতীয় অর্থবছরে দেওয়া হবে ভাতা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সচিবালয়ে গত সপ্তাহে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট–সংক্রান্ত দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এর ভিত্তিতে আজ বুধবার নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটি আবার বৈঠকে বসছে।
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো তৈরির জন্য বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশসংবলিত কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রস্তাবিত বেতনকাঠামোয় বিভিন্ন গ্রেডে (ধাপ) ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।