বিশ্বের মোট ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার, শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ৪৫তম

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালে কাঁদানে গ্যাসের শেল সরানোর চেষ্টা করছেন এক বিক্ষোভকারী। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ছবি: রয়টার্স

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট–ঘাটতির প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে নেমেছে লাখো মানুষ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়া এসব বিক্ষোভে কোথাও কোথাও সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু এখন ফ্রান্স। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত শনিবার দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছে।

চলমান অস্থিরতা ইউরোপের দেশগুলোর সরকারের আর্থিক সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারগুলো। বছরের পর বছর বিপুল ঋণ নেওয়ায় ইউরোপের অনেক দেশই এখন গভীর ঋণসংকটে পড়েছে। সেই সঙ্গে ঋণের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

ফ্রান্সে ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঋণের সুদ মেটাতে সরকারের বাড়তি ব্যয় হওয়ায় স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমছে—এমন দাবি করছে বিক্ষোভকারীরা।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, সরকারগুলো কীভাবে ঋণ নেয়, শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের অবস্থান কোথায় এবং ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারগুলোকে কত ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে।

শীর্ষ ঋণগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ৪৫তম

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ।

বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা মার্কিন ডলারে ঋণ নেওয়ার সুবিধা পায় যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বজুড়ে ডলারের ব্যাপক চাহিদা থাকায় দেশটির ঋণের প্রতিও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাহীন ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই।

সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটির ঋণ ২২ দশমিক ৫০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি, ১৯৯ শতাংশ।

বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাজ্য চতুর্থ। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা ফ্রান্সের ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই ঋণ দেশটির জিডিপির ১১৮ শতাংশ।

এ ছাড়া ইতালির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির অর্থনীতির তুলনায় ঋণের বোঝা অনেকটাই বেশি, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। আর জার্মানির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণে ভারত সপ্তম। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন, যা দেশটির জিডিপির ৮৩ শতাংশ।

বৈশ্বিক ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই ঋণ জিডিপির ৪০ শতাংশ। ২০১০ সালে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তার মানে গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। যদিও উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের ঋণ ও জিডিপির অনুপাত এখনো তুলনামূলক কম।

আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সরকার কীভাবে ঋণ নেয়

সরকারগুলো সাধারণ মানুষের মতোই ঋণ নেয়। তবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে তারা বন্ড বিক্রি করে। বন্ড কেনার বিনিময়ে সরকার ক্রেতাদের সুদ দেয় এবং নির্দিষ্ট তারিখে ঋণের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

যেমন—১০ বছর মেয়াদি বন্ড হলো এমন একটি ঋণ, যা সরকারকে ১০ বছর পর পরিশোধ করতে হয়। এই বন্ডের ইল্ড বা সুদের হার হলো ঋণ দিয়ে বিনিয়োগকারীরা যে মুনাফা পান। একটি দেশ তার ঋণ ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবে, সে বিষয়ে আর্থিক বাজারের আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।

ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে কী হয়

বন্ডের দাম কমলে এর ‘ইল্ড’ বা মুনাফার হার বাড়ে। ফলে সরকারের জন্য নতুন ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। কোনো পরিবারের গৃহঋণের সুদ বাড়লে যেমন সংসার খরচে টান পড়ে, সরকারের ক্ষেত্রেও তা–ই হয়। সুদ পরিশোধে খরচ বেড়ে গেলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে টান পড়ে।

বর্তমানে ইউরোজোনে ফ্রান্সকে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এমনকি ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও ফ্রান্সকে এখন বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। ইউরোজোনের বাইরে শুধু যুক্তরাজ্যই বর্তমানে ফ্রান্সের চেয়ে বেশি সুদে ঋণ নিচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় শুধু গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটে থাকা দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদ দিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়েছিল।

সুদ পরিশোধেই ব্যয় ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার

সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—সব মিলিয়ে বিশ্বে মোট ঋণের পরিমাণ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে।

ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এতে করে মাথাপিছু হিসাবে বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের ওপর ঋণের বোঝা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। আর ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে।

ঋণের এই বিপুল বোঝার সঙ্গে বাড়ছে সুদ পরিশোধের খরচও। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। এই অর্থ বিশ্বের সামরিক খাতে ব্যয় হওয়া ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যয় হওয়া ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় হওয়া ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি।

সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে জনসেবামূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমে যায়। বাড়তি সুদের খরচ মেটাতে সরকারকে কর বাড়ানো বা অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানোর পথও বেছে নিতে হতে পারে। এর প্রভাব শুধু সরকারের বাজেটেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ে। সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে বন্ধকি ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বেড়ে যেতে পারে।