এশিয়া অঞ্চলেও শীর্ষ ধনী মানুষের সংখ্যা কমেছে, যদিও তা ইউরোপ ও আমেরিকার মতো অত বেশি হারে নয়। এশিয়ায় এই শীর্ষ ধনী মানুষ কমার হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে এশিয়ায় শীর্ষ ধনী মানুষের সংখ্যা কমলেও চীনে বেড়েছে। ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশটির শীর্ষ ধনী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

শীর্ষ ধনীদের বসবাসের জায়গা থেকে বিশ্বের শীর্ষ শহর হচ্ছে হংকং। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেসের স্থান। হংকং শহরে বসবাসরত শীর্ষ ধনীর সংখ্যা ১৫ হাজার ২৩৫ জন, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কম। এরপর নিউইয়র্ক শহরে বসবাসরত শীর্ষ ধনীর সংখ্যা ১৪ হাজার ২৩৫।

তবে শীর্ষ দুই শহরের সঙ্গে তৃতীয় ও পরবর্তী শহরগুলোর ব্যবধান অনেক বেশি। তৃতীয় স্থানে থাকা লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে বসবাসরত শীর্ষ ধনীর সংখ্যা ৭ হাজার ৭১৫ জন এবং চতুর্থ স্থানে থাকা টোকিও শহরে তাঁদের সংখ্যা ৬ হাজার ৪২০। পঞ্চম স্থানে আছে লন্ডন, সে শহরে শীর্ষ ধনীর সংখ্যা ৬ হাজার ১০২। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, শীর্ষ ১০ শহরের মধ্যে কেবল লন্ডনেই চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত শীর্ষ ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

নারী শীর্ষ ধনী

বিশ্বের শীর্ষ ধনী মানুষের কাতারে নারীদের হিস্যা ১১ শতাংশ। অনুপাতের দিক থেকে তা এখনো উল্লেখযোগ্য না হলেও নারী শীর্ষ ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এই প্রবৃদ্ধির চিত্র প্রণিধানযোগ্য। অর্থাৎ মানুষের চিন্তার জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। সেই সঙ্গে নারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে আসছেন।

উদ্যোক্তা হচ্ছেন। আর নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, শীর্ষ ধনী নারীদের সম্পদের একাংশ অন্তত উত্তরাধিকার সূত্রে এসেছে। দেখা গেছে, নারী শীর্ষ ধনীর মধ্যে ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ পেয়েছেন। ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ লাভের পাশাপাশি নিজেরাও ব্যবসা-বাণিজ্য করে সম্পদের মালিক হয়েছেন আর ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ নারী নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।

অন্যদিকে পুরুষ শীর্ষ ধনীদের মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে ধনী হয়েছেন। ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ লাভের পাশাপাশি নিজেরা কষ্ট করে কেষ্ট লাভ করেছেন আর ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ শুধু নিজের পরিশ্রমে এত দূর এসেছেন।

তবে দেশে দেশে বা অঞ্চলে অঞ্চলে এই ধারার ভিন্নতা দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দেশে স্বপ্রতিষ্ঠিত শীর্ষ নারী ধনীর সংখ্যা বেশি হলেও জার্মানিতে কম।  

নারী শীর্ষ ধনীরা আবার দান-খয়রাতে বেশি আগ্রহী, পুরুষের তুলনায়।

ধনীরা কে কোন খাতের

প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, শীর্ষ ধনী পুরুষদের ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যাংকিং ও আর্থিক জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত, নারীদের ক্ষেত্রে যা ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া পুরুষদের মধ্যে ব্যবসা ও গ্রাহক সেবায় আছেন ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, আবাসন খাতে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, উৎপাদনশীল খাতে ৫ দশমিক ১ শতাংশ ও প্রযুক্তি খাতে ৫ শতাংশ।

তবে নারীদের বেলায় বিশেষ একটি দিক হলো, শীর্ষ নারী ধনীদের ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ অলাভজনক সামাজিক খাতে জড়িত, পুরুষদের বেলায় যা মাত্র ৫ শতাংশ।

শীর্ষ ধনী ও বৈষম্য

বিশ্বে এত সংখ্যক শীর্ষ ধনী থাকার অর্থ হলো উচ্চ মাত্রার বৈষম্যের উপস্থিতি। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর বিশ্বে শতকোটি ডলারের মালিকেরা সংখ্যা মহাজাগতিক হারে বেড়েছে। বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদন ২০২২ অনুসারে, বিশ্বের ধনীতম শূন্য দশমিক ১ শতাংশ মানুষের হাতে এখন প্রায় ৮০ ট্রিলিয়ন বা ৮০ লাখ কোটি ইউরোর আর্থিক ও স্থাবর সম্পত্তি আছে। আর বিশ্বের শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর হাতে সম্পদ আছে ৭৭ শতাংশ আর দরিদ্রতম ৫০ শতাংশের হাতে আছে মাত্র ২ শতাংশ।

এই শীর্ষ ধনীদের বিরুদ্ধে সব সময় উচ্চকণ্ঠ প্রখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবিদ ও সাড়া জাগানো বই ক্যাপিটাল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্রন্থের লেখক টমাস পিকেটি। তিনি সম্প্রতি নিজের ব্লগে লিখেছেন, ২০ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুক্রমিক করব্যবস্থা (যার যত বেশি আয়, তার করহার তত বেশি) অত্যন্ত সফল ছিল।

১৯৩০-৮০ সাল পর্যন্ত সে দেশের সবচেয়ে ধনী মানুষের আয়কর হার ছিল ৮০-৯০ শতাংশ। ঠিক সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তখন সে দেশে আজকের মতো বৈষম্য ছিল না এবং শিক্ষায় তারা সবচেয়ে এগিয়ে ছিল।

সে জন্য তাঁর মত, শতকোটি ডলারের মালিকদের ওপর ৮০-৯০ শতাংশ করারোপ করা হোক। আর সেই অর্থের বড় অংশ সরাসরি দরিদ্র দেশগুলোতে পাঠানো হোক।

এদিকে ওয়েলথ এক্সের ‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮’-তে বলা হয়েছিল, ধনকুবের বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে সবার ওপরে। বাংলাদেশে তখন বছরে শতকরা ১৭ দশমিক ৩ ভাগ হারে শীর্ষ ধনীর সংখ্যা বাড়ছিল।

বাংলাদেশের পরেই ছিল চীনের অবস্থান। চীনে তখন শীর্ষ ধনী বাড়ছিল ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। এরপর ছিল যথাক্রমে ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং ও আয়ারল্যান্ড। ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ধনকুবের বৃদ্ধির হার পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশের এই চিত্র দেওয়া হয়েছিল।