ইউরোপে মন্দাভাবের প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতে

প্রকৌশল পণ্য, সোনার গয়না, দামি পাথর, পোশাক, তুলা ও প্লাস্টিকজাত পণ্য রপ্তানি বেশি মার খাচ্ছে।

অলঙ্করণ: আরাফাত করিম

উচ্চ মূল্যস্ফীতির জেরে আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশে আবারও মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই এসব দেশের চাহিদায় টান পড়েছে।

ইউরোপ-আমেরিকার উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়েছে ভারতের রপ্তানিতেও। গত আগস্ট মাসে দেশটির রপ্তানির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় ১ শতাংশ কমেছে। অর্থের অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। উন্নত দেশে চাহিদা হ্রাসের পাশাপাশি গম, ইস্পাত, লোহার বল—এসব পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার কারণেও ভারতের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে বলে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড–এর প্রতিবেদনে জানা গেছে।

প্রকৌশল পণ্য, সোনার গয়না, দামি পাথর, তৈরি পোশাক, তুলা ও প্লাস্টিকজাত পণ্য রপ্তানি বেশি মার খাচ্ছে বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের চালে রপ্তানি শুল্ক আরোপ এবং খুদ পাঠানোয় নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় এগুলোর রপ্তানিও ৪০-৫০ লাখ টন কমতে পারে বলে আশঙ্কা।

ভারতের রপ্তানির ২৫ শতাংশ হলো প্রকৌশল পণ্য। সে দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্ট মোশন কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান রাকেশ শাহ বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ২০২১-২২ সালে ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের পণ্য বিদেশে গিয়েছিল, এবারের লক্ষ্য ১২ হাজার ৭০০ কোটি। কিন্তু তা অর্জন সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। আগস্ট মাসে প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে—গয়না ও দামি পাথরের রপ্তানি কমেছে ৪ শতাংশ আর প্লাস্টিকজাত পণ্যের ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

অল ইন্ডিয়া রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিজয় শেঠিয়া বলছেন, কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে চালের রপ্তানি নামতে পারে ১.৬ থেকে ১.৭ কোটি টনে। বিশ্ববাজারে চালের ৪২ শতাংশ সরবরাহ করে ভারত। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নয়াদিল্লির পদক্ষেপে খাদ্যের দাম বাড়বে; যদিও দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, ভারতে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দরিদ্রদের সস্তায় খাদ্যশস্য জোগান দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য।

শিল্প মহল বলছে, রপ্তানি কমলে প্রভাব পড়বে শিল্পোৎপাদনেও। কারণ, তখন কোম্পানিগুলো উৎপাদন হ্রাস করবে, এর প্রভাবে অনেক মানুষের উপার্জনে প্রভাব পড়তে পারে, অনেকে কাজও হারাতে পারেন।

ভারত থেকে খাদ্য আমদানি করতে চায় পাকিস্তান

গত এপ্রিল মাসে ভারত থেকে গম, চিনিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য আমদানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু দেশজুড়ে প্রবল আর্থিক সংকট এবং বন্যা পরিস্থিতির জেরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মঙ্গলবার সে দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ থেকে খাদ্য আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছেন। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের একাংশ জানাচ্ছে, যেসব দেশ থেকে খাদ্য আমদানির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে, সেই তালিকায় ভারতও আছে। খবর দ্য ডনের

পাকিস্তানের অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়েছে আগেই। তার ওপর বন্যা পরিস্থিতির কারণে রাজস্ব ঘাটতি এমন জায়গায় গেছে যে তা সামাল দিতে নাভিশ্বাস উঠেছে শরিফ সরকারের।

সম্প্রতি পাকিস্তানি অর্থমন্ত্রী মিফতা ইসমাইল জানিয়েছিলেন, ভারত থেকে খাদ্য আমদানির সম্ভাবনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। পাকিস্তানি সেনার ‘অনুমোদন’ ছাড়া এ কথা তাঁর পক্ষে বলা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সে দেশের সংবাদমাধ্যমের একাংশ। যদিও প্রধানমন্ত্রী শরিফ নিজে ভারত থেকে খাদ্য আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে কিছু বলেননি।

চাল রপ্তানিতে ভারতের শুল্ক

স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় ভারতের ধান উৎপাদনকারী প্রধান রাজ্যগুলোতে এ বছর ধান উৎপাদন কম হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উত্তর প্রদেশে ধানের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকার চাল রপ্তানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। রপ্তানি নিরুৎসাহিত করে নিজেদের মজুত বাড়াতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। গত বৃহস্পতিবার ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে বিভিন্ন ধরনের নন-বাসমতী চাল রপ্তানিতে এ শুল্ক আরোপ করে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য যেসব দেশ ভারতের চালের দিকে তাকিয়ে ছিল, তাদের দুর্গতি বাড়বে।

এদিকে রপ্তানি কমে আসলেও চলতি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি অর্থ বছরে ভারতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিও ভালো হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।