নকল ও নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলে বিকল হচ্ছে যন্ত্র, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি

দেশে শিল্পকারখানা, গণপরিবহন, নৌপথ, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে যান্ত্রিক আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হলেও তার সুরক্ষায় মূল চালিকা শক্তি ‘ইঞ্জিন অয়েল’ বা লুব্রিকেন্ট খাতে থাবা বসিয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ও নিম্নমানের পণ্য।

নকল তেল ব্যবহারের কারণে একটি ইঞ্জিনের গড় আয়ু কমে যাচ্ছেছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও যান্ত্রিকীকরণে বর্তমানে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। শিল্পকারখানার প্রসার, কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার, আকাশ ও নৌপথে যাতায়াত এবং সড়ক পরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে পুরো দেশ এখন যন্ত্রনির্ভর। কিন্তু এই বিপুল যান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবনীশক্তি বা লুব্রিকেন্টের (ইঞ্জিন অয়েল) বাজারে এক ভয়াবহ নৈরাজ্য চলছে। কোনো ধরনের মানদণ্ড না মেনে ব্র্যান্ডের পণ্যের আদলে তৈরি করা নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশের কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। এতে শুধু যে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, বরং সরকারের বিপুল রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেমে আসছে বিপর্যয়।

দেশে এখন ব্যাপক যন্ত্র সচল রয়েছে। আর তার বিপরীতে নকল লুব্রিকেন্টের বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে। এর একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক গত জুলাই মাসে প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’ জাতীয় প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ অর্থাৎ ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪৯টিই হলো শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের চাকা সচল রাখতে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের ব্যবহার হচ্ছে। শুমারির তথ্য বলছে, দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে সেবা খাত। এখানেও যন্ত্রের বেশ ব্যবহার আছে। এই সেবা খাতের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রের ব্যবহার পরিবহন খাতে। 

পরিবহন খাতের এই বিশাল যান্ত্রিক বহরের চিত্র আরও সুস্পষ্ট হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যে। গত জুন মাসে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে নিবন্ধিত বৈধ মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯০টি। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশে মোটরসাইকেলসহ সড়কপথে মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭ লাখ ২৪ হাজার। অন্যদিকে নৌপথ ও কৃষি খাতেও যন্ত্রের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘নৌযান শুমারি ২০২৬’–এর লিস্টিং অপারেশন বা নৌযান তালিকাভুক্তি কার্যক্রমের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ইঞ্জিনচালিত নৌযান রয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬০টি। এর বাইরে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষি খাতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জ্বালানি তেলনির্ভর ২১ লাখ ৩০ হাজার কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে।

এ ছাড়া জেনারেটর এবং অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির প্রায় অধিকাংশই জ্বালানি তেল দিয়ে চলে, যেখানে লুব্রিকেন্ট বা ইঞ্জিন অয়েলের ব্যবহার অপরিহার্য।

নকল তেল ব্যবহারের কারণে একটি ইঞ্জিনের গড় আয়ু প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যাচ্ছে এবং জ্বালানি অপচয় বাড়ছে অন্তত ১৫ শতাংশ।

এই বিশাল যান্ত্রিক খাতের সুরক্ষার জন্য যে ইঞ্জিন অয়েল বা লুব্রিকেন্ট প্রয়োজন, তার বাজার এখন অনেকটাই অবৈধ ব্যবসায়ী চক্রের দখলে। প্রথম আলো ও মবিলের (এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসি)র যৌথ উদ্যোগে ‘নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলের প্রভাব, ঝুঁকিতে ইঞ্জিন অর্থনীতি পরিবেশ’ শীর্ষক বিশেষ সংলাপে নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীদের আলোচনা থেকেও লুব্রিকেন্ট বাজারের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। দেশে বর্তমানে লুব্রিকেন্ট অয়েলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন। এর মধ্যে বৈধ ও মানসম্মত কোম্পানিগুলো জোগান দিতে পারছে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টন, যা মোট চাহিদার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারের বাকি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বা বিপুল পরিমাণ চাহিদার জোগান দিচ্ছে অনুমোদনহীন, নকল ও নিম্নমানের ভেজাল লুব্রিকেন্ট।

এমজেএল বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মুকুল হোসেন বলেছেন, দেশে এখন আধুনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। অথচ এই ইঞ্জিনে আশির দশকের পুরোনো মানের লুব্রিকেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিসংখ্যান তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে মোট ব্যবহৃত তেলের ৫২ থেকে ৬০ শতাংশই এই পুরোনো মানদণ্ডের। আধুনিক ইঞ্জিনে মানহীন ও ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ ঘর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে ইঞ্জিনের ক্ষতি হচ্ছে।  

বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, নকল তেল ব্যবহারের কারণে একটি ইঞ্জিনের গড় আয়ু প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায় এবং জ্বালানি অপচয় বাড়ে অন্তত ১৫ শতাংশ। একটি মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে যেখানে ১৫-২০ বছর বাহনটি সচল থাকার কথা, সেখানে ভেজাল তেলের কারণে মাত্র ৭-৮ বছরেই তার ইঞ্জিন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে চরম আর্থিক দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে।

এই সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, মানহীন লুব্রিকেন্টের কারণে দামি যন্ত্রপাতির অকালমৃত্যু ঘটছে এবং জ্বালানি অপচয় বাড়ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করছে। সংকট সমাধানে তিনি সংশ্লিষ্ট সব রেগুলেটরি সংস্থার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ওপর জোর দেন।

অবৈধ বাজারের এই দৌরাত্ম্য ও বাড়তি মুনাফার বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, আসল তেলের চেয়ে নকল তেলে কেন ২০০ টাকা বেশি লাভ থাকে, তা খতিয়ে দেখে আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, শুধু খুচরা দোকান নয়, অবৈধ উৎপাদনের মূল উৎসে অন্যান্য সংস্থাকে নিয়ে দ্রুত যৌথ অভিযান চালানো হবে।

মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক জানান, পুরোনো মান বাতিল করে ইতিমধ্যে আধুনিক ‘বিডিএস ২০২৯’ মানদণ্ড প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ঢাকার আটটি স্পটে অভিযান চালিয়ে সব কটিতেই নকল তেলের প্রমাণ মিলেছে। অসাধু চক্রকে রুখতে মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধন করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই নিম্নমানের লুব্রিকেন্ট পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য যে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। যানবাহনের ক্ষতিকর ধোঁয়ার কারণে বায়ুদূষণ বেড়ে দেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বায়ুদূষণের অন্তত ৩০ শতাংশই আসে যানবাহনের বিষাক্ত নির্গমন থেকে। ভেজাল ও নিম্নমানের তেল ইঞ্জিনে সঠিকভাবে পুড়তে পারে না, ফলে বাতাসে অত্যন্ত ক্ষতিকর নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড এবং শ্বাসতন্ত্র ধ্বংসকারী অতিসূক্ষ্ম পিএম ২.৫ কণা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু বাতাস নয়, গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ বা কৃষিযন্ত্র থেকে অপরিশোধিত পোড়া তেল যত্রতত্র মাটি ও ড্রেনে ফেলার কারণে মাটি ও পানির প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।