৯ মার্চের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার নির্দেশ
আগামী ৯ মার্চের মধ্যে দেশের শিল্পকারখানার শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে আগামী ১২ মার্চের মধ্যে ঈদুল ফিতরের বোনাস দেওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সভায় এ নির্দেশনা দেন আরিফুল হক চৌধুরী। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সেখানে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৯৪তম সভা ও তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (আরএমজি বিষয়ক টিসিসি) ২৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় দেশের সার্বিক শ্রম পরিস্থিতি পর্যালোচনা, তৈরি পোশাক খাতে শ্রম অসন্তোষ নিরসন ও আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কলকারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ ও ছুটি মঞ্জুর বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। আর সঞ্চালনায় করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া।
১৮০ কারখানা শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকিতে
সভায় শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের তালিকায় থাকা ৯ হাজার ৪০৩টি কারখানার মধ্যে গত বছর কোরবানি ঈদের সময় ২৮৭টি তৈরি পোশাক কারখানা বকেয়া বেতন দিতে পারেনি। চলতি বছরেও বেতন-বোনাস পরিশোধ না হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ১৮০টি তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রম অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
শিল্প পুলিশ আরও জানায়, দেশের ৭৪৭টি কারখানা গত জানুয়ারি মাসের বেতন দিতে পারেনি। এর মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানা ৩৫৭টি। আর ১৪৯টি কারখানার নভেম্বর-ডিসেম্বরের বেতন বকেয়া রয়েছে।
শ্রমিক ও মালিকপক্ষ যা জানিয়েছে
সভায় শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা ঈদের আগেই তাঁদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-বোনাস পরিশোধের দাবি জানান। একই সঙ্গে মার্চ মাসের সম্পূর্ণ বা অর্ধেক আগাম বেতন দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা। সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে ছুটি দেওয়ার অনুরোধও করেন তাঁরা। ঈদে দূরপাল্লার পরিবহন ভাড়া বেড়ে যায়। এটি নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। এ ছাড়া নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়।
শ্রমিকপক্ষে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও যেন শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে না হয়। বেতন ঠিক সময়ে দিলেই শ্রমিকদের আর রাস্তায় নামতে হবে না।
অনুষ্ঠানে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সর্বশেষ সাত মাস ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে। গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি মাসের বেতনই অনেক মালিক দিতে পারেননি। এতে বোঝা যাচ্ছে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। এ অবস্থায় মার্চ মাসের ১৫ দিনের বেতন দেওয়ার দাবি অবাস্তব।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, এক বছর ধরে শিল্পকারখানাগুলো অনেক খারাপ অবস্থায় পড়েছে। এই পরিস্থিতি বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। সবাইকে এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
ঈদের ছুটি হবে শ্রম আইন অনুসারে
সবার বক্তব্য শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আগামী ৭ কর্মদিবসের (৯ মার্চ) মধ্যে যেন শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন দিয়ে দেওয়া হয়। আর ঈদের বোনাস যেন ১২ মার্চের মধ্যে দেওয়া হয়। আর মালিক-শ্রমিক আলোচনার ভিত্তিতে কোনো কারখানা চাইলে মার্চ মাসের অর্ধেক বেতন দিতে পারে। তবে সেটি কারখানার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া শ্রম আইন অনুসারে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটির বিষয়টি ঠিক করবে।
আরিফুল হক চৌধুরী আরও বলেন, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে, যেন ঈদের সময় জনভোগান্তি সৃষ্টি না হয়। ঈদের আগে-পরে প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের কোনো কারণ ছাড়া লে-অফ বা ছাঁটাই করা যাবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, তৈরি পোশাকশ্রমিকদের জন্য রেশনের কথা বলা হচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা ফ্যামিলি কার্ডের কাজ দ্রুত আগাচ্ছে। এটি নিম্ন আয়ের পরিবারের মাঝে কিছুটা হলেও উপকার করবে। তৈরি পোশাক খাতেও এমন বিকল্প কিছু করা যায় কিনা দেখা হবে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, দেশ এবং বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিত মাথায় রেখে কোনোমতেই যেন শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়, তাই বেতন-ভাতা সঠিক সময়ে পরিশোধ করতে হবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এক মাসও হয়নি। ফলে পুরোনো সমস্যা সমাধানে সরকারকে একটু সময় দিতে হবে। তাই এ বছর ঈদের সময় কোনো আন্দোলন না করার জন্য শ্রমিকনেতাদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
ঈদের সময় পরিবহনে ভাড়া যাতে অতিরিক্ত না বাড়ে, সে বিষয়ে সরকার কাজ করবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।