ব্যাংকে ‘পরিবারতন্ত্রের’ সুযোগ রেখে আইনের নতুন খসড়া

ব্যাংকপ্রতীকী ছবি

বেসরকারি ব্যাংকে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব কমাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল, তার কয়েকটি থেকে সরে আসছে বর্তমান সরকার। একই পরিবারের তিনজনকে ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা ছিল ব্যাংকমালিকদের চাওয়া। ঋণখেলাপি পরিচালকদের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান থাকছে না।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বর্তমানে একই পরিবার থেকে তিনজন সদস্য একই সময়ে কোনো ব্যাংকের পরিচালক থাকতে পারেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক এই সংখ্যা কমিয়ে দুজন করার প্রস্তাব করে। এ ছাড়া একজন পরিচালকের মেয়াদ (টানা) ছয় বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বর্তমান আইনে একজন ব্যক্তি একই ব্যাংকের পরিচালক পদে একটানা ১২ বছর থাকতে পারেন। সে মেয়াদ পূর্ণ হলে তিন বছর বিরতি দিয়ে আবার পরিচালক হওয়া যায়।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে গত ২০ সেপ্টেম্বর ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইনের খসড়ার ওপর পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বর্তমান আইনে একজন ব্যক্তি একই ব্যাংকের পরিচালক পদে একটানা ১২ বছর থাকতে পারেন। সে মেয়াদ পূর্ণ হলে তিন বছর বিরতি দিয়ে আবার পরিচালক হওয়া যায়।

জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ৪ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নেওয়া হয়েছে। তবে এখনই চূড়ান্ত কিছু হয়ে যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক এটি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করে খসড়া পাঠাবে। তারপর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় যাবে।

বৈঠকে প্রাথমিকভাবে একেকটি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে প্রস্তাবিত দুজনের বদলে তিনজনকে পরিচালক রাখা ও টানা মেয়াদের ক্ষেত্রে ৬ বছরের বদলে ৯ বছর করার পক্ষে অবস্থান নেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

সূত্র জানিয়েছে, বিএবি বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকার আমলের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেছে, এক পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা কমিয়ে দিলে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো ও পরিচালনা পর্ষদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সতর্কতা দরকার।

বিএবি মনে করে, পরিচালনা পর্ষদে দরকার হচ্ছে ব্যাংকের প্রতি বেশি মনোযোগী ও অঙ্গীকারসম্পন্ন পরিচালক। মেয়াদ কমালে অভিজ্ঞতার ঘাটতি হবে ও ব্যাংক খাতে নেতিবাচক বার্তা যাবে। পরিচালকের মেয়াদ কমালেও তা ১২ বছরের পরিবর্তে ৯ বছর করা যেতে পারে।

সূত্র জানিয়েছে, বিএবি বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকার আমলের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেছে, এক পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা কমিয়ে দিলে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো ও পরিচালনা পর্ষদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সতর্কতা দরকার।

বিএবির চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার গতকাল বুধবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ওই সময় যে খসড়া তৈরি হয়েছিল, তাতে অনেক অসংগতি ছিল। বিএবি মতামত ঠিকই দিয়েছিল। তবে তা পুরোপুরি উঠে আসেনি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে তাঁরা মতামত তুলে ধরেছেন। যতটুকু তিনি জানতে পেরেছেন, নতুন খসড়ায় তাঁদের মতামত রাখা হচ্ছে।

ব্যাংক খাতে পরিবারের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরির বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে আবদুল হাই সরকার বলেন, নতুন আইনের খসড়ায় সরকার ব্যাংক খাতের সার্বিক স্বার্থ রক্ষা করবে বলে তাঁরা আশাবাদী।

অবশ্য বিএবির যুক্তিকে ঠিক মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। কারণ, অতীতে একটানা দীর্ঘ সময় থাকতে দিয়েই ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র কায়েম হয়েছে এবং দুর্দশায় পড়েছে ব্যাংক খাত। ২০১৮ সালের আগে পরিচালকদের একটানা মেয়াদ ছিল ৬ বছর, যা ২০১৮ সালে ৯ বছর ও ২০২৩ সালে আরও বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন ঘিরে ২০২৩ সালে জাতীয় সংসদে হইচই ও হট্টগোল হয়েছিল। ওই বছরের ৮ জুন ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০২৩ জাতীয় সংসদে তুলেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সংশোধনীর মূল প্রস্তাবে পরিচালক পদের মেয়াদ বাড়ানো-কমানোর বিষয়ে কোনো প্রস্তাব ছিল না। সংসদে বিল পাসের আগে হঠাৎ করে সরকারি দলের সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম এ বিষয়ে সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। তিনি পরিচালক পদের মেয়াদ টানা ১২ বছর করার প্রস্তাব দেন এবং সেটাই পাস হয়।

অভিযোগ আছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে। এসব গ্রুপের পরিচালকেরা নিজেদের পাশাপাশি তাঁদের স্ত্রী/স্বামী, ছেলে-মেয়ে, জামাতা ও নিকটাত্মীয়দের ব্যাংকের পর্ষদে বসাতেন।

তখন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরাও এ সংশোধনের প্রতিবাদ করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। জাতীয় পার্টির তৎকালীন সংসদ সদস্য মুজিবুল হক সংসদে বলেন, চেয়ারম্যান-পরিচালকের কারণে ন্যাশনাল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক শেষ। পরিচালকেরাই হচ্ছেন ব্যাংক লুটপাটের মূল হোতা।

মূলত সরকারঘনিষ্ঠ ব্যাংকমালিকদের ‘আবদারেই’ ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালকদের একটানা ১২ বছর পদে থাকার সুযোগ করে দিয়েছিল। এর নেপথ্যে ছিলেন বিএবির সাবেক সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। তিনি এখন কারাগারে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিদেশে চলে গেছেন। আর সাবেক দুই গভর্নর ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদার প্রকাশ্যে আসছেন না।

অভিযোগ আছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে। এসব গ্রুপের পরিচালকেরা নিজেদের পাশাপাশি তাঁদের স্ত্রী/স্বামী, ছেলে-মেয়ে, জামাতা ও নিকটাত্মীয়দের ব্যাংকের পর্ষদে বসাতেন।

কয়েকটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু ব্যাংক এখন দুর্দশায় রয়েছে; যে কারণে এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। এ রকম পাঁচটি ব্যাংককে নিয়ে সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক গঠন করছে। সরকারের কোষাগার থেকে একীভূত এ ব্যাংককে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের করের টাকা। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ব্যাংক আইনের একটি খসড়া করেছিল। অবশ্য সেই খসড়া অধ্যাদেশ আকারে জারি করে যেতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার।

বিএনপি সরকার ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিষয়ে কী অবস্থান নিচ্ছে, তা জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ৪ অক্টোবর প্রথম আলোকে জানান, তিনি মনে করেন যে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গোটা ব্যাংক খাতে সুশাসন বজায় রাখার বিষয়গুলো সংশোধিত আইনে থাকবে।

কয়েকটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু ব্যাংক এখন দুর্দশায় রয়েছে; যে কারণে এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। এ রকম পাঁচটি ব্যাংককে নিয়ে সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক গঠন করছে। সরকারের কোষাগার থেকে একীভূত এ ব্যাংককে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের করের টাকা।

পরিবারের সংজ্ঞা

একই পরিবারের সদস্যরা যাতে ভিন্ন সম্পর্কের পরিচয়ে পর্ষদে থাকার সুযোগ নিতে না পারেন, সে জন্য ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞা বিস্তৃত করার প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন গভর্নর ছিলেন আহসান এইচ মনসুর।

বিদ্যমান আইনে পরিবারের সদস্য বলতে কোনো ব্যক্তির স্ত্রী/স্বামী, পিতা, মাতা, পুত্র, কন্যা, ভাই, বোন এবং ওই ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভাবি, ভগ্নিপতি, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা (স্ত্রীর ক্ষেত্রে দেবর-ননদ) এবং ওই ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদেরও পরিবারের সংজ্ঞায় যোগ করার কথা বলা হয়েছিল।

বিএবি ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞা শুধু স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষে। সংগঠনটি উদাহরণ দিয়ে বলেছে, ভারতের আইনে পরিবার বলতে স্বামী-স্ত্রী বা হিন্দু অবিভক্ত পরিবারকে বোঝানো হয়। পাকিস্তানে তা স্বামী-স্ত্রী, নির্ভরশীল সরাসরি বংশধর ও নির্ভরশীল ভাই-বোন। শ্রীলঙ্কায় পরিবার বলতে শুধু স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীল সন্তানকে বোঝানো হয়।

১৯৯৬ সালে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বাধীন ব্যাংক সংস্কার কমিটির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছিল যে একই পরিবারের একাধিক সদস্য পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হতে পারবেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গত রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাংকের পর্ষদে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানো, স্বতন্ত্র পরিচালক বৃদ্ধি, পরিচালকদের মেয়াদ কমানোসহ বেশ কিছু বিষয়ে আন্তর্জাতিক চর্চা অনুসরণ করে খসড়াটি করা হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে সরকার সরে আসছে, যা হতাশাজনক। অর্থাৎ যেই লাউ সেই কদু। তিনি বলেন, ‘পরিচালকদের প্রবণতা হচ্ছে “আমার ব্যাংক”, “আমাদের পরিবারের ব্যাংক” ইত্যাদি। আইন করে এ ধরনের অশুভ মানসিকতা থেকে পরিচালকদের সরিয়ে আনা সরকারের দায়িত্ব বলে মনে করি।’

এখনো তো চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হয়নি। কী করা হচ্ছে, তা মনে হয় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও পুরোপুরি দেখেননি। মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়গুলো আসবে। আমি আশা করব, ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্যের স্বার্থে সরকার বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী

খেলাপি পরিচালকদের ক্ষেত্রে ছাড়

বর্তমান নিয়মে কোনো পরিচালকের নিজের ঋণ বা তাঁর গ্যারান্টি দেওয়া ঋণ খেলাপি হলে তা নিয়মিত করার জন্য দুই মাস সময় পাওয়া যায়। ওই সময়ের মধ্যে ঋণ নিয়মিত করতে না পারলে তিনি পরিচালক পদ হারান। তাঁর শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয়েরও বিধান রয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়ায় আরও কঠোর বিধান যোগ করার প্রস্তাব ছিল। পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও সংশ্লিষ্ট পরিচালককে পদ হারাতে হবে—এমন বিধান প্রস্তাব করা হয়েছিল।

নতুন খসড়ায় এই প্রস্তাব বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি একবার পরিচালক পদ হারানোর পর আবার পরিচালক হওয়ার সুযোগ পাওয়ার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭ ধারায় বর্তমানে আমানতকারী বা ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের প্রমাণ পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি ধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, পর্ষদ ভাঙার পর প্রশাসক বা উপযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নতুন ব্যবস্থায় পরিচালনা পর্ষদ বহাল রেখেই প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রাখা হতে পারে। অর্থাৎ পুরো পর্ষদ ভেঙে না দিয়েও প্রয়োজনে প্রশাসকের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এটি কার্যকর হলে ব্যাংকের পর্ষদে মালিকদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও সংকটের সময় ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ বাড়বে। তবে পর্ষদ বহাল রেখে ব্যাংকের অনিয়ম দূর করা যাবে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে।

আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থী পদ্ধতিতে পরিচালিত ব্যাংকের নতুন আমানত নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার বিধান রয়েছে বর্তমানে। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে ওই ধরনের ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারা সংযোজন হতে পারে। সে ধারায় ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে নতুন করে ঋণ, বিনিয়োগ বা মূলধন দেওয়াও বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংককে।

সংশোধনীর খসড়ায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া দেনাদার কোম্পানির পরিচালকেরা পদত্যাগ তো করতে পারবেনই না, তাঁদের বরখাস্ত, অপসারণ বা অব্যাহতিও দেওয়া যাবে না। অনুমোদন ছাড়া কোনো শেয়ারও হস্তান্তর বা বিক্রি করতে পারবেন না তাঁরা।

স্বতন্ত্র পরিচালক ৫০% হবে না

ব্যাংক কোম্পানি সংশোধন অধ্যাদেশের খসড়ায় বলা হয়েছিল, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ হবে ১৫ সদস্যের, যার ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ অর্ধেকই থাকবেন স্বতন্ত্র পরিচালক। বর্তমানে ২০ সদস্যের পর্ষদ রয়েছে ব্যাংকগুলোতে, যার মধ্যে স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিধান আছে ৩ জন। পর্ষদে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য বা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা থাকতে পারবেন না—এমন একটি ধারা সংযোজনের প্রস্তাব ছিল।

ওই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বিএবি বলেছে, স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা ২ থেকে ৩ জন হতে পারে। স্বতন্ত্র পরিচালক অর্ধেক থাকলে শেয়ারমালিকদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে এবং ব্যাংক পরিচালনায় মুনাফা ও প্রবৃদ্ধির চেয়ে কেবল নীতিপালন অগ্রাধিকার পাবে। সবার মতামত নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সর্বোচ্চ ৩ জন স্বতন্ত্র পরিচালকের পক্ষেই রয়েছে।

‘নতুন বিপর্যয়ের আশঙ্কা’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংক খাতে অতীতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের বড় অংশ হয়েছে মূলত পর্ষদ সদস্যদের যোগসাজশে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকদের একটানা মেয়াদ ছয় বছরে আনার প্রস্তাবটি তো ভালো ছিল। এক পরিবার থেকে দুজনের বেশি পরিচালক না রাখার প্রস্তাবটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যেসব বিবেচনায় এগুলো শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাতে আশঙ্কা তৈরি হয়, ব্যাংক খাতে আবার না নতুন কোনো বিপর্যয় দেখা দেয়।

মুস্তফা কে মুজেরী আরও বলেন, ‘এখনো তো চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হয়নি। কী করা হচ্ছে, তা মনে হয় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও পুরোপুরি দেখেননি। মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়গুলো আসবে। আমি আশা করব, ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্যের স্বার্থে সরকার বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করবে।’