খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার সবই সাময়িক। দীর্ঘ মেয়াদে সংকট নিরসনে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে ডলারের চাহিদা কমাতে হবে। সুদহারের সীমা তুলে দিতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীদের টাকা ধার করে ডলার কেনার খরচ বাড়ে। আর তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে পণ্য দুটির চাহিদা কমাতে হবে।

সংকট নিরসনে গত বৃহস্পতিবার চারটি সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে ব্যাংকের ডলার ধারণের সীমা (এনওপি) অর্ধেক কমানো, রপ্তানিকারকের প্রত্যাবাসন কোটায় (ইআরকিউ) ধারণকৃত ডলারের ৫০ শতাংশ নগদায়ন, ইআরকিউ হিসাবে জমা রাখার সীমা কমিয়ে অর্ধেকে নামানো এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ইউনিটে স্থানান্তর। নতুন সিদ্ধান্তগুলোর ফলে ডলার নিয়ে চলমান সংকট কমবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি আমদানি তদারকি করতে ৫০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বেসরকারি যেকোনো আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও এ কে খান গ্রুপের পরিচালক আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক দেশ সংকটে পড়ে গেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। কারণ, আমরা আমদানিনির্ভর দেশ। এ জন্য এখন অতি সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই। বিশেষ করে ডলার খরচের বিষয়ে, সেটা সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই। যেহেতু এটা বৈশ্বিক সমস্যা সেহেতু শক্তভাবেই তা মোকাবিলা করতে হবে।’

আবুল কাসেম খান আরও বলেন, ‘দেশ যাতে মন্দা ও অতি মূল্যস্ফীতির মধ্যে পড়ে না যায়, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, করোনা থেকে সবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশ। কর্মসংস্থানের বড় অংশ বেসরকারি খাতে। তাই নীতিনির্ধারকদের জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের জুলাই-মে ১১ মাসে ৮ হাজার ১৪৯ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। আর জুলাই-জুন সময়ে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলার ও প্রবাসী আয় হয়েছে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার।

আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে, প্রবাসী আয় কমেছে ১৫ শতাংশ। ফলে যে আয় হচ্ছে তা দিয়ে ব্যয় মিটছে না। আবার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে সংকট প্রকট হয়েছে।

এ কারণে গত তিন মাসে ডলারের দাম আনুষ্ঠানিকভাবে ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ৯৩ টাকা ৯৫ পয়সা হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো এখন প্রবাসী আয় আনছে ১০১-১০২ টাকায়। আর আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রি করছে এর চেয়ে বেশি দামে। ফলে চাপে পড়েছেন আমদানিকারকেরা। বেড়ে গেছে সব ধরনের আমদানি পণ্যের দাম।

এদিকে ডলার-সংকট মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে রিজার্ভ কমে এখন চার হাজার কোটি ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ কতটা কাজে দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একজন আমদানিকারক প্রথম আলোকে জানান, গত বৃহস্পতিবার আমদানি দায় পরিশোধে ব্যাংক তাঁর কাছে প্রতি ডলারের দাম ধরেছে ১০১ টাকা ৫০ পয়সা। ঋণপত্র (এলসি) খোলার সময়ে বলা হয়েছিল ডলারের দাম ৯৩ টাকা। প্রতি ডলারে ৮ টাকা ৫০ পয়সা বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

ডলার-সংকট নিরসনে এর আগে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করা হয়। দামি গাড়ি, প্রসাধনী, স্বর্ণালংকার, তৈরি পোশাক, গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য বৈদ্যুতিক সামগ্রী, পানীয়সহ ২৭ ধরনের পণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে ব্যাংকঋণ বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে আমদানি খরচ কিছুটা কমবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন