শীর্ষে এমজিআই, বড় উত্থান ডেল্টার, আরও পেছাল সিটি গ্রুপ

গত দুই দশকের মধ্যে বেশির ভাগ সময় দেশে নিত্যপণ্য আমদানিতে শীর্ষে ছিল শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ। তিন বছর আগে শীর্ষ অবস্থানটি হারিয়েছে গ্রুপটি। এরপর টানা দুই অর্থবছর দ্বিতীয় শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছিল সিটি গ্রুপ। আর্থিক সংকটে থাকা সিটি গ্রুপ এবার দ্বিতীয় শীর্ষস্থানটিও হারিয়েছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছর শেষে নিত্যপণ্য আমদানিতে দুই ধাপ পিছিয়ে চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে সিটি গ্রুপ।

অন্যদিকে টানা তৃতীয় অর্থবছরের মতো নিত্যপণ্য আমদানিতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই। তিন বছর আগে সিটি গ্রুপকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছিল এমজিআই। এ ছাড়া গত অর্থবছর শেষে এক ধাপ করে এগিয়ে এই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে যথাক্রমে টি কে গ্রুপ ও স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস। নাবিল গ্রুপ দ্বিতীয়বারের মতো পঞ্চম অবস্থান ধরে রেখেছে। এর বাইরে গত এক অর্থবছরের ব্যবধানে নিত্যপণ্য আমদানিতে বড় উত্থান হয়েছে ডেল্টা এগ্রোফুড ও প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে নিত্যপণ্যের আমদানিকারক–ভিত্তিক এই চিত্র পাওয়া গেছে। নিত্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে চিনি, পাম তেল, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, সয়াবিন বীজ, গম, মসুর ডাল, মটর ডাল ও ছোলা আমদানিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ও এর কাঁচামাল সয়াবিন বীজকে ‘সয়াবিন তেল ও কাঁচামাল’ নামে একটি শ্রেণিতে রেখে সাতটি পণ্যশ্রেণির হিসাব করা হয়েছে এই বিশ্লেষণে।

সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে এসব পণ্য আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টন। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি বা ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১ কোটি ৩৩ লাখ টন, যার মূল্য ছিল ৬৮১ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। আর খরচ বেড়েছে ৩ শতাংশের কম। অর্থাৎ বেশি পণ্য আমদানি হলেও সেই অনুপাতে খরচ বাড়েনি। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় এবং তুলনামূলক কম দামের পণ্যের আমদানি বৃদ্ধির কারণে এই তারতম্য হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন আমদানিকারকেরা।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, উল্লিখিত সাত নিত্যপণ্যের মধ্যে চাহিদার মাত্র ১১ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি ৮৯ শতাংশের জোগান আসে আমদানির মাধ্যমে। ফলে বড় আমদানিকারকদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, অর্থায়নের সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর দেশের নিত্যপণ্যের বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল।

সিটি গ্রুপ থেকে এখন এমজিআই

সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে এমজিআই ১৫১ কোটি ডলারের প্রায় ৩৩ লাখ টন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির আমদানি বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। সাত পণ্যের মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশই ছিল গ্রুপটির। আর এসব নিত্যপণ্য আমদানি করে এমজিআই সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে তিন হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

চিনি ও সয়াবিন তেলের কাঁচামাল সয়াবিন বীজ আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে এমজিআই। এ ছাড়া অপরিশোধিত ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য আমদানিতেও প্রতিষ্ঠানটির বড় অংশীদারত্ব রয়েছে। আমদানির মূল্য ও পণ্যের বৈচিত্র্য—দুই দিক থেকেই প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে রয়েছে গ্রুপটি।

জানতে চাইলে এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ভোগ্যপণ্য খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের কারণে কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে। আবার দেশে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আগাম আমদানি করতে হয়েছে।

* সাত পণ্যের মোট আমদানি ব্যয়ের ৫৬ শতাংশ শীর্ষ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের হাতে।
* ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে এসব পণ্য আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টন।
* এসব পণ্য আমদানিতে গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার।

এমজিআইয়ের বিপরীত চিত্র ছিল সিটি গ্রুপের। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে সবচেয়ে বেশি সময় নিত্যপণ্য আমদানিতে নেতৃত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একসময় চিনি, ভোজ্যতেল, আটা-ময়দাসহ নিত্যপণ্যই ছিল গ্রুপটির মূল ব্যবসার কেন্দ্র। প্রায় চার বছর আগে কাগজ, সিমেন্ট ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসসহ বিভিন্ন খাতে বড় বিনিয়োগ শুরু করে সিটি গ্রুপ। একই সময় থেকে গ্রুপটির নিত্যপণ্যের কাঁচামাল আমদানি কমতে থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেশ কয়েক বছর ধরে ব্যাংকঋণ পরিশোধ ও অর্থায়নের চাপে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ কারণে তাদের আমদানি কমে গেছে। তবে আমদানি কমার কারণ সম্পর্কে সিটি গ্রুপের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সিটি গ্রুপ ৫৬ কোটি ডলারের নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে। এক বছরের ব্যবধানে গ্রুপটির আমদানি কমেছে ৪০ শতাংশ। ফলে দ্বিতীয় স্থান থেকে চতুর্থ অবস্থানে নেমে গেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এমজিআই ও সিটির আমদানির ব্যবধানও এখন বেশ বড়। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে সিটির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি অর্থের নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে এমজিআই।

দ্বিতীয় টি কে গ্রুপ, তৃতীয় স্মাইল ফুড

গত অর্থবছর শেষে এক ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠেছে টি কে গ্রুপ। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৭৯ কোটি ডলার খরচ করে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য আমদানি করেছে। সাত পণ্যের মোট আমদানি ব্যয়ের ১১ শতাংশের বেশি করেছে গ্রুপটি। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে এখন শীর্ষে রয়েছে টি কে গ্রুপ। এর বাইরে গম ও ডাল আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি।

টি কে গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। সেই সঙ্গে আমদানিও বাড়ছে। ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে আরও বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নিত্যপণ্য আমদানি ও সরবরাহে টি কে গ্রুপের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।’

অন্যদিকে এক ধাপ এগিয়ে তৃতীয় অবস্থানে উঠেছে স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস। আবুল খায়ের গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিত্যপণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত। তবে ২০২৪ সাল থেকে এ খাতে তাদের তৎপরতা দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

স্মাইল ফুড একটি চিনি পরিশোধনাগার ও একটি ভোজ্যতেল কারখানা কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। চিনি ও ভোজ্যতেল খাতে বড় বিনিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানটির কাঁচামাল আমদানিও দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সয়াবিন ও পাম তেলের পাশাপাশি সয়াবিন বীজ, ডাল, গম ও অপরিশোধিত চিনি আমদানি করছে।

সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে স্মাইল ফুড ৭০ কোটি ডলারের ৮ লাখ ৪৪ হাজার টন পণ্য আমদানি করেছে। সাত পণ্যের মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশই ছিল প্রতিষ্ঠানটির।

পঞ্চমে নাবিল, বড় উত্থান ডেল্টার

রাজশাহীকেন্দ্রিক নাবিল গ্রুপ টানা দ্বিতীয় অর্থবছরের মতো নিত্যপণ্য আমদানিতে পঞ্চম অবস্থান ধরে রেখেছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৪০ কোটি ডলারের ১২ লাখ ৯৩ হাজার টন পণ্য আমদানি করেছে। নাবিল গ্রুপ মূলত গম, ছোলা, মসুর ডাল ও মটর ডাল আমদানি করে। গম আমদানিতে প্রতিষ্ঠানটি এখন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। আমদানি করা পণ্যের পরিমাণের দিক থেকেও শীর্ষ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নাবিলের অবস্থান বেশ শক্তিশালী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ দেশে যাতে নিত্যপণ্যের সংকট না হয়, সে জন্য ধারাবাহিকভাবে আমদানি অব্যাহত রেখেছি। নতুন করে একটি ফ্লাওয়ার মিলে বিনিয়োগ করেছি। এ বছর মিলটি চালু হলে আমদানি ও সরবরাহে আমাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।’

তবে এবারের তালিকায় সবচেয়ে বড় উত্থান হয়েছে ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ছিল ১৩তম অবস্থানে। এক বছরের ব্যবধানে সাত ধাপ এগিয়ে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে তারা। সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ডেল্টা এগ্রোফুড ২৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত গম, সয়াবিন বীজ ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করে।

জানতে চাইলে ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত কারখানার উৎপাদন শুরু হওয়ায় আমাদের আমদানি বেড়েছে। এই কারখানায় গ্যাস সংযোগ পাওয়া গেলে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। তখন আমদানি আরও বাড়বে।’

সেরা দশে প্রাণ–আরএফএল

গত অর্থবছর শেষে নিত্যপণ্য আমদানির তালিকায় শীর্ষ দশে উঠে এসেছে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ছিল ১২তম। এক বছরের ব্যবধানে তিন ধাপ এগিয়ে নবম অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতে বড় বিনিয়োগে যাওয়ার পরই গ্রুপটির কাঁচামাল আমদানি বাড়তে শুরু করেছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রাণ–আরএফএল ২১ কোটি ডলারের প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন নিত্যপণ্য আমদানি করেছে।

প্রায় ২৫ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করে তালিকার সপ্তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ এডিবল অয়েল বা বিইওএল। প্রতিষ্ঠানটি মূলত ভোজ্যতেল আমদানি করে। বোতলজাত ভোজ্যতেলের বাজারেও প্রতিষ্ঠানটির শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে।

সরকারি খাতে খাদ্য বিভাগ বিদায়ী অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাত লাখ ৬০ হাজার টন গম আমদানি করেছে। প্রায় ২৩ কোটি ডলারের গম আমদানি করে সরকারি খাত রয়েছে অষ্টম অবস্থানে। অন্যদিকে ১৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে জহির গ্রুপ দশম অবস্থানে রয়েছে।

বদলাচ্ছে পুরোনো সমীকরণ

নিত্যপণ্য আমদানিকারকদের মধ্যে এবারের তালিকায় পরিবর্তন শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান বদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন আমদানিতে সক্রিয় থাকা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে পড়ছে, আবার আগে তুলনামূলক কম সক্রিয় ছিল এমন প্রতিষ্ঠান দ্রুত সামনে আসছে।

সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে এস আলম গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের নামে আলোচ্য সাত পণ্যশ্রেণির নতুন কোনো চালান খালাসের তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে এমজিআইয়ের নেতৃত্ব আরও সুসংহত হয়েছে এবং সিটি গ্রুপের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অন্যদিকে স্মাইল ফুড, ডেল্টা এগ্রোফুড ও প্রাণ–আরএফএলের উত্থানে নিত্যপণ্য আমদানির পুরোনো প্রতিযোগিতার সমীকরণ বদলে যাচ্ছে।