এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ভারত, চীন ও রাশিয়ার ঋণগুলো বাণিজ্যিক এবং পরিশোধের সময়ও বেশ কম। এখন কিছু কিছু ঋণের কিস্তি শুরু হয়ে গেছে। তাই ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরিমাণও বাড়ছে। যেহেতু এখন অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়, তাই আগামী পাঁচ-সাত বছর এ ধরনের বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

কঠিন শর্তের এসব ঋণের কয়েকটি প্রকল্প থেকে বিনিয়োগ উঠে আসবে না বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তাঁর মতে, চীনের অর্থায়নে পদ্মা রেল সংযোগ সেতু থেকে বিনিয়োগ উঠিয়ে আনা কঠিন হবে। কারণ, রেলওয়ে এখনো সনাতনী ব্যবস্থায় চলছে। দুর্বল পরিকল্পনা ও দুর্নীতি রেলওয়েকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া রাশিয়ার ঋণের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও সরকারের জন্য বোঝা হয়ে যাবে। 

ঋণ পরিশোধ ৪০০ কোটি ডলার ছাড়াবে

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে ১১২ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। ছয় মাসে এত ঋণ পরিশোধ আগে কখনোই হয়নি। সামনে আরও বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে—এমন পূর্বাভাসও মিলেছে ইআরডির এক প্রতিবেদনে। নতুন ঋণ চুক্তি না হলে এবং শুধু পাইপলাইনে থাকা প্রতিশ্রুতি থেকে ঋণ মিললে এবং ডলারে আগামী কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধে কী পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হবে, তা দেখানো হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সব মিলিয়ে ২৭৮ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। প্রতিবছরই এ পরিমাণ বাড়বে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৪০২ কোটি ডলার। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ৫১৫ কোটি ডলার খরচ হবে। এরপর ঋণ পরিশোধ কমতে থাকবে। 

২০১৬-১৭ অর্থবছরে মাত্র ১১৭ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছিল সরকারকে। এরপর প্রতিবছরই তা বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ২০১ কোটি ডলার। তার মধ্য দিয়ে গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বার্ষিক ঋণ পরিশোধ ২০০ কোটি ডলার ছাড়াল। প্রতিবছর যত বৈদেশিক সহায়তা এ দেশে আসে, তার এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ ঋণ পরিশোধ করতে হয়। 

ঋণ পরিশোধের খরচ বাড়াচ্ছে 

গত এক দশকে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনাল, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি। এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে রাশিয়া, চীন ও ভারতের কাছ থেকে বাণিজ্যিক ঋণ নিতে হয়েছে।

বাংলাদেশ এত দিন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আসছে।

এখন আস্তে আস্তে চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো দেশের কাছ থেকে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে তুলনামূলক কঠিন শর্তে শত শত কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে। এসব ঋণের অসুবিধা হলো বিশ্বব্যাংক, এডিবি কিংবা জাপানের ঋণের তুলনায় এসব ঋণ পরিশোধের সময় বেশ কম।

গত এক দশকে এই তিন দেশের কাছ থেকে সব মিলিয়ে ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চুক্তি হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে চীনের ১২ প্রকল্পে ১ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলার, রাশিয়া রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলার এবং ভারত তিনটি লাইন অব ক্রেডিটে (এলওসি) ৭৩৬ কোটি ডলার দিচ্ছে। 

বিশ্বব্যাংক, এডিবির ঋণ পরিশোধের জন্য মোটাদাগে সময় পাওয়া যায় ৩২ থেকে ৩৫ বছর। কিন্তু গ্রেস পিরিয়ডের পর চীন ও ভারতের ঋণ পরিশোধ করতে হবে ১৫ থেকে ২০ বছরে। 

দুটি প্রকল্পের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নেওয়া ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলারের রাশিয়ার ঋণ পরিশোধ করতে হবে মাত্র ১০ বছরে। ২০২৬ সালে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হবে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণে ১৯৫ কোটি ডলার দিয়েছে চীন। এ প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি অর্থবছর থেকে এ প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

 চীন, রাশিয়া ও ভারত—তিন দেশের ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে লন্ডন ইন্টারব্যাংক লেনদেনের সুদের হারের (লাইবর) সঙ্গে পৌনে ২ শতাংশ সেবামাশুল যুক্ত করে। লাইবর সাধারণত আড়াই থেকে ৩ শতাংশ হয়। সুদের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো সংস্থার চেয়ে খুব বেশি তফাত নেই।