বাণিজ্য জোট আরসিইপির সদস্য হতে চায় বাংলাদেশ, লাভ কী

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আরসিইপি বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। ২০২৪ সালে আরসিইপির সদস্যদেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই দেশের সিংহভাগ পণ্য আমদানি–রপ্তানি হয়ফাইল ছবি: প্রথম আলো

বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য জোট ‘আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব’ (আরসিইপি)–এ বাংলাদেশের সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া আরেক ধাপ এগিয়েছে। বাংলাদেশসহ চার আবেদনকারী দেশকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও কারিগরি কাজ এগিয়ে নিতে বিশেষ কার্যদল গঠনের সুপারিশ অনুমোদন করেছেন জোটভুক্ত দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীরা।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি দেশের এই বাণিজ্য জোটে বাংলাদেশের পাশাপাশি চিলি, শ্রীলঙ্কা ও হংকং যোগ দেওয়ার আবেদন করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আরসিইপির যৌথ কমিটির বৈঠকে আবেদনকারী দেশগুলোর বিষয়ে বিশেষ কার্যদল গঠনের সুপারিশ করা হয়। পরে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম আরসিইপি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তা অনুমোদন করা হয়েছে।

আরসিইপি হলো চীন, জাপান, কোরিয়াসহ ১৫টি দেশের জোট। এই জোটের সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। আরসিইপির সদস্য হলে জোটভুক্ত দেশগুলোর বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সেবা, বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ব, ই-কমার্স, প্রতিযোগিতা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সুবিধা পাওয়ার বিষয়ও থাকবে।

বাংলাদেশ ২০২২ সালে প্রথম আরসিইপিতে যোগদানের প্রাথমিক উদ্যোগ ও আলোচনা শুরু করে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে চিঠি পাঠিয়ে আগ্রহের কথা জানায়। তবে নতুন সদস্য নেওয়ার বিষয়ে তখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি আরসিইপি।

আরসিইপির সদস্যরা ২০২৫ সালে নতুন দেশকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া অনুমোদন করে। এরপর বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, চিলি ও হংকং আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক আবেদনপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিয়েছে।

গত জুনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশ আরসিইপিতে যোগ দিতে আগ্রহী এবং এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার সমর্থনকে স্বাগত জানায়। বাংলাদেশ এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার সমর্থনও চেয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, জোটের পরিধি সম্প্রসারণ এবং নতুন সদস্য নেওয়ার পথনকশা অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ আগ্রহী দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও কারিগরি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে গঠিত কার্যদল কাজ করবে।

বাণিজ্যসচিব মো.আতাউর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আরসিইপির সদস্য হতে চাচ্ছি। ভালো খবর হচ্ছে, গত সোমবার আরসিইপির যৌথ কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশসহ চার দেশেরই সদস্যপদ পাওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের বের হওয়ার প্রক্রিয়া যেখানে এগোচ্ছে, সেখানে জোটটির সদস্য হতে পারলে আমরা লাভবান হব।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য আরসিইপিতে যোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ মূলত রপ্তানি বাজারে শুল্ক–সুবিধা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের কারণে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ যে শুল্ক–সুবিধা হারাতে পারে, আরসিইপির সদস্য হলে জোটভুক্ত দেশগুলোর বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পণ্য বাণিজ্যে সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি সেবা, বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ব, ই-কমার্স, প্রতিযোগিতা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সুবিধা পাওয়ার বিষয়ও থাকবে।

শুল্ক–সুবিধা পাওয়া যাবে, দিতেও হবে

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আরসিইপিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক–সুবিধা ধরে রাখা, বৈশ্বিক সরবরাহের ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো এবং দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরসিইপিতে কারা আছে, বাণিজ্য কত

বর্তমানে আরসিইপিতে রয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ-ইস্ট এশিয়ান নেশনস বা আসিয়ানের ১০টি দেশ: ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম আছে। পাশাপাশি আরও পাঁচটি দেশ আছে। দেশগুলো হলো: চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড।

জোটটি বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। ২০২৪ সালে সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আরসিইপিভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের মোট আমদানির ৫৩ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং রপ্তানির ৭ দশমিক ৯২ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ জোটটির সদস্য হলে বাংলাদেশের জন্য আমদানি ও রপ্তানির বড় বাজারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

‘দক্ষতার সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে’

জানা গেছে, আরসিইপির সদস্য হতে হলে বিদ্যমান ১৫ সদস্যেরই সম্মতি প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলাদেশকে চুক্তির নিয়মকানুন মেনে চলার সক্ষমতা দেখাতে হবে এবং সদস্যদেশগুলোর জন্য বাজারসুবিধার প্রস্তাব দিতে হবে।

ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন মূল কাজ হলো সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা, বাজারসুবিধার প্রস্তাব এবং চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি। কোন পণ্যে কতটা শুল্ক–সুবিধা দেওয়া হবে, কত সময়ে তা বাস্তবায়ন হবে এবং বাংলাদেশকে কী ধরনের বাজারসুবিধা দিতে হবে, এসব বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যানিলার বৈঠকে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও গঠনমূলক সংলাপের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সংস্কার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) করার দরকার পড়বে। সে বিবেচনায় আরসিইপির মতো বাণিজ্যিক জোটের সদস্য হতে পারলে বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘কিছু দেশের সঙ্গে এফটিএ করার উদ্যোগ আছে বাংলাদেশের। এদিকে আরসিইপির সদস্যদের মধ্যে কিছু সবল অর্থনীতির দেশ যেমন আছে, কিছু দুর্বল অর্থনীতির দেশও আছে। বাণিজ্য সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোকে সুবিধা দেওয়ার বিষয়ও আছে। এখানেই মূল চ্যালেঞ্জটি। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে দক্ষতার সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে। বাংলাদেশ তা করবে বলে আস্থা রাখতে চাই।’