একটি গান হতে পারে শতকোটি টাকার পণ্য: অর্থমন্ত্রী
সৃজনশীল অর্থনীতিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে, বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একটা ছোটখাটো গান যখন হিট হয়, একজন সাধারণ মানুষের একটা গান যখন হিট হয়ে যায়, এটা কি শত শত কোটি টাকার প্রোডাক্ট (পণ্য) হয়ে গেল না? আমাদের মধ্যে সেটা আছে। সৃজনশীলতা আমাদের দেশের মধ্যে আছে।’
আজ সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্যোগে ‘ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিলের উদ্বোধন ও ঋণের চেক বিতরণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, অর্থসচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। কর্মসংস্থান ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ এফ এম মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরুণ কুমার চৌধুরী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্বের কোনো কোনো দেশের অর্থনীতিতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ১০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ ২ থেকে ৩ শতাংশে নিতে পারলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
দেশের খাবার, গান, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সৃজনশীল কাজকে বৈশ্বিক বাজারে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, গ্রামগঞ্জে অনেক সৃজনশীল কাজ হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোকে এত দিন অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। যথাযথ সহায়তা দিয়ে এসব সৃজনশীলতাকে বাজারযোগ্য পণ্যে পরিণত করতে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সারদের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সৃজনশীলতাকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করা দরকার।
থাইল্যান্ডের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচির উদাহরণ দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশটির গ্রামের মানুষ বাড়িতে বসে পণ্য তৈরি করেন। সরকারের সহায়তায় কাঁচামাল, দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে এসব পণ্য বিশ্ববাজারে বিক্রির উপযোগী করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের সহায়তাকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, গ্রামের তৈরি পণ্য সংগ্রহ, প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা গেলে সেগুলো সরাসরি বিদেশে পাঠানো সম্ভব। এতে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি তা ১ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনার তাগিদ দেন। এতে ব্যাংকটির বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।
শুধু ঋণ নয়, সহায়তাও দিতে হবে
কর্মসংস্থান ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু ঋণ দিলেই হবে না; ঋণগ্রহীতাদের পণ্যের মানোন্নয়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনেও সহায়তা দিতে হবে। তখন ১০০ টাকার একটি পণ্যকে মূল্য সংযোজন করে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার পণ্যে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
দেশের শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে দারুন সৃজনশীলতা রয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থের অভাবে তাঁরা তা কাজে লাগাতে পারেন না। আবার অনেকে ব্যাংকে যেতে ভয় পান বা ব্যাংকিং সেবার আওতায় নেই। তাই তাঁদের কাছে অর্থায়ন পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণগ্রহীতাকে শুধু ঋণগ্রহীতা হিসেবে দেখলে হবে না। ব্যাংকের সঙ্গে তাঁর একটি সম্পর্ক থাকতে হবে এবং ব্যবসা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। উদ্যোক্তাকে ব্যাংকের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
কর্মসংস্থান ব্যাংক এরই মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আরও ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হলে মোট ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং কুটির শিল্পই বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তাই বড় শিল্প ও বড় প্রকল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিলের পাইলট (পরীক্ষামূলক) প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জামানত ছাড়াই আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কর্মসংস্থান ব্যাংকের রয়েছে।
৫–৬% সুদে ঋণের পরিকল্পনা
অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিল প্রকল্পের আওতায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণে যেখানে সাধারণত ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নেওয়া হয়, সেখানে এই ঋণের সুদ অনেক কম।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, প্রাথমিকভাবে তিনটি জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। পরে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ এফ এম মতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ২ শতাংশ সুদে তহবিল সরবরাহ করে, তাহলে কর্মসংস্থান ব্যাংক বর্তমানের চেয়ে আরও কম সুদে ঋণ দিতে পারবে। বর্তমানে ব্যাংকটি সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে।