অর্থবছরের সময়কাল বদলে গেলে কী হবে, সুবিধা-অসুবিধা কী

প্রতীকী ছবি

দেশের অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সময়কাল হবে এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয়ে পরের বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত। এত দিন ধরে জুলাই থেকে জুন—এই সময়কাল ধরেই অর্থবছর হিসাব হচ্ছে।

অর্থবছরের নতুন সময়কাল বাস্তবায়ন শুরু হলে সরকারি পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আসবে নতুন সময়সূচি। এ ছাড়া মানুষের জীবনে প্রতিবছরের আয়–ব্যয়ের হিসাব, কর ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব–নিকাশেও প্রভাব পড়বে।

অর্থবছর কী, নতুন সময়কাল কী

অর্থবছর হলো সরকারের আর্থিক হিসাবের এক বছর। এই অর্থবছর ধরেই সরকার কত আয় করবে, কত খরচ করবে, তা নিয়ে বাজেট করে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দও অর্থবছর হিসাবেই দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী বাজেট বাস্তবায়ন করে।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ও প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), শুল্ক–কর, বিনিয়োগ, দেশি–বিদেশি ঋণ ও দায়দেনা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ–লোকসানের হিসাব অর্থবছর ধরেই করা হয়।

গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। নতুন সময়কাল হবে ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে পরের বছর ৩১ মার্চ পর্যন্ত। এ সময় ধরে ২০২৮–২৯ অর্থবছরের যাবতীয় হিসাব–নিকাশ করা হবে। আর আগামী অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৭–২৮ অর্থবছর হবে রূপান্তরমূলক বছর। এই অর্থবছরের মেয়াদ হবে মাত্র ৯ মাস। এরপর নতুন সময়কাল ধরে, অর্থাৎ ২০২৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে অর্থবছর শুরু হবে, শেষ হবে ২০২৯ সালের মার্চ মাসে। এভাবে চলতে থাকবে।

অর্থবছর কেন বদলানো হচ্ছে

সরকারের প্রধান যুক্তি উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকাণ্ডে গতি বাড়ানো। এখন বাংলাদেশে অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই। অর্থাৎ বর্ষার শুরুতেই অর্থবছর শুরু, এর ফলে রাস্তা, সেতু, ড্রেন বা ভবনের মতো অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ করা কঠিন হয়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ে, খরচ বাড়ে। কাজের মান খারাপ হয়।

অন্যদিকে নতুন সময়কালে, অর্থাৎ এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরে বাজেট কার্যকর করা হলে অর্থবছর শুরু হবে গ্রীষ্মের শুরুতে। ফলে এপ্রিল–জুনের শুকনো মৌসুমেই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

এ ছাড়া প্রতিবছরই দেখা যায়, অর্থবছরের শেষ সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে জুন মাসে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করেন অনেক ঠিকাদার। এভাবে কাজ করে বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিবছরই। জুন মাসে বৃষ্টির কারণে অনেক সময় কাজের মানও ঠিক থাকে না।

নতুন সময়কালে কী সুবিধা হবে

অর্থবছরেই শুরুতেই এপ্রিল মাস থেকে অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে। আবার অর্থবছরের শেষ চার–পাঁচ মাসে (নভেম্বর–মার্চ) শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে গতি বাড়ানো সম্ভব হবে। সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে বর্ষার বাধা কিছুটা কমবে।

এ ছাড়া অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় পুরোটাই শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।

একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এডিপিতে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। গত জুন মাসেই খরচ হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এক মাসেই খরচ মোট খরচের ২৮ শতাংশের বেশি।

অর্থবছরের সময়কাল বদলে ফেললে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের সুবিধা হলেও সাময়িকভাবে কিছু সমস্যাও হবে। যেমন সরকারি হিসাবব্যবস্থা নতুন বর্ষ অনুসারে আনতে হবে। বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার এবং তথ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ–লোকসানের হিসাবের সময়কালও বদলে যাবে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কী হবে

সরকারের অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব–নিকাশও পরিবর্তন করতে হবে। যেমন করব্যবস্থা ও কোম্পানির হিসাবের সঙ্গে নতুন অর্থবছরের সামঞ্জস্য করতে হবে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের হিসাব–নিকাশের ব্যবস্থা সফটওয়্যারে করে। এসব খাতে তাদের বিপুল খরচ করতে হয়। এখন অর্থবছরের নতুন সময়কাল পরিবর্তনের ফলে তাদের সফটওয়্যার আপডেট করতে হবে। এতে নতুন করে খরচ বাড়বে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যারের পাশাপাশি বাজেট, আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষার সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে; পাশাপাশি তাদের আয়–ব্যয় ও করের হিসাব–নিকাশের সময়কালও পাল্টে যেতে পারে।

তবে অর্থবছরের নতুন সময়কালের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ–লোকসানের হিসাবে খুব একটা বদলাবে না। শুধু সময় বদলাবে।

সাধারণ মানুষের কী পরিবর্তন হবে

অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি বড় কোনো পরিবর্তন হবে না। করবর্ষ ও অর্থবছর এক হওয়ায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের আয়কর গণনার সময় বদলে যাবে। এখন জুলাই–জুন সময়ের আয়ের ওপর কর দিতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় এপ্রিল–মার্চ সময়ের ওপর ভিত্তি করে রিটার্ন জমা ও কর দিতে হবে। আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আসবে। যেমন ১ এপ্রিল থেকে রিটার্ন জমা শুরু হবে।

বিনিয়োগ করে কর রেয়াত নেওয়াসহ অন্যান্য সুবিধার সময়কালও বদলে যাবে।

ইতিহাস কী বলে

মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা নববর্ষ চালু হয়। রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিকোণ থেকে তখন অর্থবর্ষ গণনা শুরু হয় এপ্রিল মাসে।

পরে উপনিবেশ আমলে ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের প্রথম বাজেট দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্কটিশ অর্থনীতিবিদ জেমস উইলসন। তখন থেকে এপ্রিল মাসে অর্থবছরের শুরু হয়। এই ব্যবস্থা চলে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত। পরে ভারত এপ্রিল–মার্চ সময়কালকে নিজেদের অর্থবছর হিসেবে বজায় রাখে। অন্যদিকে পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তান অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করে জুলাই–জুন ধরে অর্থবছর গণনা শুরু করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে একই ধারা বজায় রেখে জুলাই–জুন সময় ধরেই অর্থবছর গণণা অব্যাহত রাখা হয়।

অন্য দেশের অর্থবছর কবে শুরু

পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই জানুয়ারি–ডিসেম্বর সময়কাল ধরেই অর্থবছর হিসাব করা হয়। বিশেষ করে উন্নত দেশে এটি বেশি। জানুয়ারি–ডিসেম্বর সময়কাল ধরে অর্থবছর গণনা করা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রাশিয়া, কোরিয়া। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কাও জানুয়ারি–ডিসেম্বর ধরেই অর্থবছরের সব হিসাব–নিকাশ করে।

অন্যদিকে জুলাই–জুন ধরে যেসব দেশ অর্থবছর হিসাব করে, সেসব দেশের মধ্যে আছে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান। আর এপ্রিল–মার্চ অর্থবছরের দেশগুলো মধ্যে আছে ভারত, যুক্তরাজ্য। তবে অনেকে দেশে কর দেওয়ার সময় এবং অর্থবছরের সময়ের মধ্যে ভিন্নতা আছে।

বিশেষজ্ঞ মত

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থবছর ১ জুলাই–৩০ জুন থেকে পরিবর্তন করে ১ এপ্রিল–৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। বর্ষাকালের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির অসামঞ্জস্য কমিয়ে প্রকল্পের গতি ও মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সেলিম রায়হানের মতে, শুধু অর্থবছরের সময়সূচি বদলালেই উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, অর্থছাড়ে বিলম্ব বা দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো দূর হবে না। বরং নতুন কাঠামো কার্যকর করতে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। তাই এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক সংস্কার হিসেবে দেখার পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন কতটা পরিকল্পিত ও দক্ষ হচ্ছে, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত করা গেলে অর্থবছর পরিবর্তন দেশের উন্নয়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।