বেসরকারি খাতের ৫৫% কর্মী এআই ব্যবহার করেন, মেটলাইফের জরিপ
দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের মানসিক চাপ কমাতে বড় ভরসা হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। দেশের বেসরকারি খাতের প্রায় ৫৫ শতাংশ বা অর্ধেকের বেশি কর্মী বর্তমানে এআই ব্যবহার করছেন। আর যাঁরা এআই ব্যবহার করছেন, তাঁদের প্রায় সবাই এর সুফল নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন।
বহুজাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ বাংলাদেশের করা সর্বশেষ ‘এমপ্লয়ি বেনিফিট ট্রেন্ডস স্টাডি (ইবিটিএস) ২০২৬’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে মেটলাইফ বাংলাদেশের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে এই জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেটলাইফ বাংলাদেশের হেড অব মার্কেটিং অ্যান্ড প্রোডাক্ট নওফেল আনোয়ার, হেড অব কমিউনিকেশনস সাইফুর রহমান প্রমুখ।
চলতি বছরের আগস্ট মাসে মেটলাইফের ইবিটিএস ২০২৬ জরিপটি করা হয়। জরিপে দেশের বিভিন্ন খাতের মোট ৭০৯ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ণকালীন কর্মী ছিলেন ৫৮৩ জন এবং নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধাসংক্রান্ত মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ছিলেন ১২৬ জন। তৈরি পোশাক খাত, এনজিও, ব্যাংক, দ্রুত বর্ধনশীল ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি), টেলিকম, খুচরা বিক্রেতা প্রভৃতি খাতের কর্মীরা জরিপে তথ্য দিয়েছেন।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এআই ব্যবহারকারীদের প্রায় ৯১ শতাংশ মনে করেন যে এটি তাঁদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন কাজে এআই ব্যবহারের ফলে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যে ও কর্মদক্ষতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে। যেমন ৫৪ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন যে এআই টুলস তাঁদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত মানসিক চাপ কমাতে সরাসরি সাহায্য করছে। প্রায় ৪৮ শতাংশ কর্মী মনে করেন এআই তাঁদের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
আবার দেখা গেছে ৪৬ শতাংশ কর্মী মনে করেন, কর্মক্ষেত্রে এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার তাঁদের কাজের অতিরিক্ত বোঝা বা হাতাশা থেকে মুক্ত রাখে। আর প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মী জানান, এআই তাঁদের গতানুগতিক কাজের চাপ কমিয়ে আরও বেশি অর্থবহ ও সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। এ ছাড়া ৩৪ শতাংশ কর্মী মনে করেন এটি তাঁদের মানসিক ক্লান্তি কমানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব রাখছে।
পিছিয়ে আছে করপোরেট সমর্থন
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে কর্মীরা এআই ব্যবহারে বেশ দক্ষ। দৈনন্দিন কাজে এআই ব্যবহারকারীদের প্রায় ৮৪ শতাংশই এটি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতি বা ব্যবধান রয়ে গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া নিয়োগকর্তাদের মধ্যে মাত্র ৫৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কর্মীদের দৈনন্দিন কাজে এআই ব্যবহারে উৎসাহ বা সুযোগ দিচ্ছেন।
যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো কর্মক্ষেত্রে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালুর সঙ্গে যুক্ত নয়, তাদের জন্য আশার কথা হলো এই খাতের প্রায় ৬২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই অদূর ভবিষ্যতে এআই টুলস গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। তারা আগামী ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে।
কর্মীরা চান ‘কেয়ার কালচার’
গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক শান্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহানুভূতিশীল সংস্কৃতি বা ‘কেয়ার কালচার’-এর বড় ভূমিকা রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা মনে করেন তাঁদের প্রতি নিয়োগকর্তা বা ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপকদের সহানুভূতি ও যত্ন রয়েছে, সেখানে চাকরির সন্তুষ্টির হার অনেক বেশি। জরিপে এই সন্তুষ্টির হার ৯২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
মেটলাইফের জরিপ অনুযায়ী ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের সার্বিক কাজের সন্তুষ্টির হার হয়েছে ৮৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৭৮ শতাংশ।
সুরক্ষামূলক সুবিধার বড় ঘাটতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মীরা জীবনবিমা, মৃত্যুর বিমা, অক্ষমতা ও গুরুতর অসুস্থতার মতো যেসব সুরক্ষাগুলোকে অত্যন্ত জরুরি বা ‘মাস্ট-হ্যাভ’ মনে করেন এবং নিয়োগকর্তারা বাস্তবে যা প্রদান করেন, তার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
উদাহরণস্বরূপ দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৩ শতাংশ কর্মী জীবন বিমা অত্যন্ত জরুরি মনে করলেও মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এর বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে। একইভাবে স্থায়ী পঙ্গুত্ব ও গুরুতর অসুস্থতার বিমা সুবিধার ক্ষেত্রেও কোম্পানিগুলোর সুবিধা প্রদানে বড় ঘাটতি রয়েছে।
মেটলাইফ বাংলাদেশের হেড অব মার্কেটিং অ্যান্ড প্রোডাক্ট নওফেল আনোয়ার বলেন, করোনার সময় থেকে স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ও সচেতনতা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিডনি রোগী, হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষ উদ্বেগে রয়েছেন। এসব রোগের চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। এ জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশা করেন। কর্মীরা এ ধরনের সুবিধা যত বেশি পাবেন, তত বেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত হন।