সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়িয়েছে।
এই অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
জাতীয় সংসদে গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মত দেন। অর্থমন্ত্রী এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। অর্থবিলে করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ টাকা।
ফলে ১ জুলাই শুরু হতে যাওয়া অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা মোট ৫০ হাজার টাকা বাড়বে। এতে মধ্যম আয়ের মানুষেরা আরেকটু স্বস্তি পাবেন।
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধিসহ তিন ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাদ দেওয়া এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন খাতে নতুন কর ও ভ্যাট ছাড়যুক্ত করাসহ ৬৪টি সংশোধনী যুক্ত করে গতকাল জাতীয় সংসদে অর্থবিল, ২০২৬ পাস হয়।
দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে রাখা দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপব্যবস্থা দূর করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।তারেক রহমান, প্রধানমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটে নানা ধরনের করছাড় দেওয়া হয়েছিল। তবে কিছু প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়। বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের নানামুখী আলোচনা, সমালোচনা ও জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবের পর সংশোধনীসহ অর্থবিল গতকাল পাস হলো।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে গতকাল সকালে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে রাখা দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপব্যবস্থা দূর করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দেশের জনগণের কাছে সেই অঙ্গীকার করছি।’
প্রধানমন্ত্রী করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোসহ বিভিন্ন খাতে করছাড়ের প্রস্তাব করেন। পরে বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর অধিকাংশ প্রস্তাব গ্রহণ করে সংসদে অর্থবিল-২০২৬ সংশোধিত আকারে পাস করা হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন।
অর্থবিল পাসের আগে সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাজেট প্রণয়নের পর সংসদ সদস্য, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া মতামত সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। দায়িত্বশীল সমালোচনা ও বাস্তবসম্মত পরামর্শ গ্রহণের ফলেই অর্থবিলে একাধিক সংশোধনী আনা হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর কমল
অর্থবিলে আগামী অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থবিলে বলা হয়েছে, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এই সীমা হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হবে। যদিও আয়করের সর্বনিম্ন হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে এবারের বাজেটে।
করমুক্ত আয়সীমার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি পূর্বানুমানযোগ্য করনীতি গড়ে তুলতে চায়, যাতে করদাতারা আগাম ধারণা পান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন।
শিক্ষা ও ব্যবসা—দুই খাতেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে অর্থবিলে। প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১০ শতাংশ কর বহাল রাখা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন।
সরকারের লক্ষ্য করের হার বৃদ্ধি করা নয়; বরং নতুন করদাতাকে করের আওতায় আনা।আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী
অর্থবিলে সেই সুপারিশ কার্যকর করা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ভাষা শিক্ষা উন্নত করা এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করার আহ্বান জানান।
বাজেটে অনলাইন ভিডিওভিত্তিক সেবা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপের প্রস্তাব ছিল। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত কর থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত হবে। এতে সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরে সংশোধনীতে করের হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়।
বাজেটে বিনা প্রশ্নে ফ্ল্যাট ও প্লটের প্রকৃত মূল্য আয়কর নথিতে দেখানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এ বিধান নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরির বিষয়টি নজরে আসার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন না হওয়ার কারণে করদাতাদের হয়রানি কমাতেই এ বিধান আনা হয়েছিল। তবে অনেকেই এটিকে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাই প্রস্তাবিত এই বিধান প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। পরে এ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
করের আওতা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবেও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান। তা বাতিলের প্রস্তাব দেন তিনি। অর্থমন্ত্রী এটিও গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-সংযোগসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেন, যা গ্রহণ করেন অর্থমন্ত্রী।
কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদিদোকানে ভ্যাট নেই
এবারের বাজেটে করের আওতা বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি ১ হাজার টাকায় অগ্রিম কর দাঁড়াবে ২ টাকা। এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে।
অর্থমন্ত্রী গতকাল বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে বা ক্ষেত্রবিশেষে হয়রানি বন্ধে তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী ‘ফ্ল্যাট রেটে’ ভ্যাট আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করছেন, কাঁচা বাজার ও ক্ষুদ্র মুদিদোকান এর আওতার বাইরে থাকবে।
অর্থবিলের সংশোধনীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সব লেনদেন করলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকার বাইরে থাকা সব কোম্পানির জন্য করপোরেট করে বাড়তি আড়াই শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ব্যাংক রেজোল্যুশনের বিতর্কিত ধারা বাতিল
জাতীয় সংসদে গতকাল ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮ক ধারা বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিএনপি সরকার গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করে। আইনটি সংসদে পাসের আগে ১৮(ক) নামে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। এই ধারায় একীভূত করা পাঁচ ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের ফেরত আসার সুযোগ রাখা হয়েছিল। সংসদে বিরোধী দলগুলো বলেছিল, এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী গতকাল বলেন, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বিলোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের বার্তা স্পষ্ট, যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, পাঁচ ব্যাংক (ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক) একীভূত করে গড়ে তোলা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তুলতে পারবেন। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী, হজ সঞ্চয়কারী এবং ডিপিএস গ্রাহকদের জন্য বিশেষ মানবিক সুবিধাও রাখা হয়েছে।
যা বললেন সংসদ সদস্যরা
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, প্রতিবছরই বাজেট নির্ঝরের স্বপ্নের মতো। প্রতিবছর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কোনো বছরই পূরণ হয় না। ঘাটতি বাড়তি থাকেই। ঋণ করে ঘাটতি পূরণ করতে হয়।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, অর্থবিল শুধু রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান নয়। কর ভার কিছুটা কমলেও সঞ্চয় ও বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সঞ্চয় মেয়াদপূর্তির আগে তুলতে না পারায় বিপদে পড়বেন মধ্যবিত্ত।
ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বলেন, বাজেট যে আমলারা বাস্তবায়ন করবেন, প্রশিক্ষণের পর তাঁদের হাবভাব আলাদা হয়ে যায়। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা যায় তাঁরা আলাদা। যেন তাঁরা এ দেশের মানুষ নন এবং এ দেশের মানুষ নিয়ে ভাবেন না।
বাজেট নিয়ে সংসদ সদস্যদের অনেকেই বক্তব্য দেন। সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের লক্ষ্য করের হার বৃদ্ধি করা নয়; বরং নতুন করদাতাকে করের আওতায় আনা। কর প্রশাসন আধুনিক করা, হয়রানি কমানো, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা এবং কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী।
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এই চারটি লক্ষ্য সামনে রেখেই বাজেট চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
আজ মঙ্গলবার সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাস হবে।