মাফিয়াতন্ত্র নির্মূল করা এখন সরকারের বড় পরীক্ষা

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার: বাজেট-পূর্ব অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে অতিথিরা। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে পিআরআইয়ের কার্যালয়েছবি: পিআরআই

দেশের ব্যাংকিং, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে গড়ে ওঠা যোগসাজশপূর্ণ পুঁজিবাদ ও মাফিয়াতন্ত্র ভেঙে দেওয়া বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তাই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে হলে শুধু চাহিদা বাড়ানোই নয়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নও জরুরি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার: বাজেট-পূর্ব অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে অর্থনীতিবিদেরা এমন অভিমত দেন। সেমিনারে দেশের মার্চ ও এপ্রিল মাসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে পিআরআইয়ের কার্যালয়ে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, অতীতে দেশের ব্যাংক খাত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়নে একচেটিয়া আধিপত্য গড়ে উঠেছিল। বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে যোগসাজশপূর্ণ পুঁজিবাদের বাস্তব চিত্র সেখানে দেখা গেছে। তিনি বলেন, ‘সেই মাফিয়াতন্ত্র যাতে আবার ফিরে আসতে না পারে, কিংবা সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও তাদের নির্মূল করা বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।’

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও বাস্তবায়নে সফলতা আসেনি। কারণ, বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে এবং সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার বাজেটের অর্থের জোগান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ফাহমিদা খাতুন। তাঁর ভাষ্য, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ। বাকি দুই মাসে অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ আদায় বর্তমান কাঠামো ও সক্ষমতায় কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে ঋণের অনুপাত বেশি হলেও বাংলাদেশের জন্য মূল উদ্বেগ ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা। রপ্তানি আয় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ না বাড়লে এই ঋণ সাধারণ মানুষের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

সভাপতির বক্তব্যে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান শুল্ককাঠামো অযৌক্তিকভাবে উচ্চ। গড় শুল্ক প্রায় ৫৫ শতাংশ হওয়ায় বাংলাদেশ গত দুই দশকে কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারেনি। প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে তিনি ছয়টি বড় সংস্কারের কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো শুল্ককাঠামোর সংস্কার ও বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ, করব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, জ্বালানি খাত সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

মূল প্রবন্ধে পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, শুধু বাজারে চাহিদা বাড়িয়ে বা সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। এ জন্য উৎপাদনশীলতাভিত্তিক নতুন প্রবৃদ্ধি মডেল প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কার্যকর সংস্কার ছাড়া বড় সম্প্রসারণমূলক বাজেট মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান নাসিরুদ্দিন আহমেদ করনীতি ও কর প্রশাসন আলাদা করার পক্ষে মত দেন।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, গত এক দশকে গুটিকয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং কম সুদে ঋণ নিয়ে অর্থ পাচার করেছে। এর ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা এখন উচ্চ সুদের চাপে পড়েছেন।