খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দিনাজপুরে খুব বেশি প্রবাসী আয় আসে না। হঠাৎ করে জুলাইয়ে এই জেলায় আড়াই কোটি ডলার প্রবাসী আয় আসার কারণও অজানা। তাই অক্টোবরে এসে প্রবাসী আয় কমার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে জেলাটি। এ কারণে খাতসংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা, প্রবাসী আয়ের নামে অন্য কোনো অর্থ হঠাৎ করে ওই জেলায় হয়তো বেশি এসেছে। আর চট্টগ্রাম জেলায় বড় ব্যবসায়ীদের আবাস। এ কারণে সেখানে হুন্ডি চক্রও বেশি সক্রিয়। আবার ওই জেলার বেশির ভাগ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। আর প্রবাসী আয়ের হুন্ডি সবচেয়ে বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এই কারণে চট্টগ্রাম জেলায় বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসা কমেছে বলে ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। 

জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে গত এপ্রিল থেকে দেশে ডলারের সংকট দেখা দেয়। এরপর সংকট সামাল দিতে ব্যাংকগুলো বেশি দামে প্রবাসী আয় আনা শুরু করে। এতে ডলারের দাম ১১৫ টাকা ছাড়িয়ে যায়। তাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নড়েচড়ে বসে। প্রথমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই ডলারের দাম নির্ধারণ করে দেয়। পরে ডলারের দাম বেঁধে দেওয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয় ব্যাংকগুলোর হাতে। গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাফেদা মিলে ডলারের দাম ঠিক করছে। এবিবি ও বাফেদার বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী এখন প্রবাসী আয়ে ডলারের দাম সর্বোচ্চ ১০৭ টাকা। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৬৬ কোটি ডলার। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি মাস শেষেও প্রবাসী আয় ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে না। গত অক্টোবরে প্রবাসী আয় এসেছিল ১৫২ কোটি ডলার। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবাসী আয়ে ডলারের যে দাম, তার চেয়ে হুন্ডিতে দাম অনেক বেশি। এ কারণে হুন্ডি ব্যবসা এখন জমজমাট। আর হুন্ডি জমজমাট মানে অর্থ পাচারও বাড়ছে। এ কারণে বিদেশে অনেকে হুন্ডি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। যাঁরা বিদেশে সম্পদ গড়ছেন, তাঁদের ধরতে হবে। তবে কারও সদিচ্ছা আছে বলে মনে হয় না। প্রবাসী আয় বাড়াতে ডলারের দামের পার্থক্য যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি প্রবাসী বন্ডে বিনিয়োগের সীমা তুলে দিতে হবে।’ 

জানা গেছে, বিদেশে সবচেয়ে বেশি কর্মী রয়েছে কুমিল্লা জেলার। এরপরই কর্মী পাঠানোর শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল ও ঢাকা। তবে প্রবাসী আয় সবচেয়ে বেশি আসছে ঢাকা জেলায়। কারণ, ঢাকা জেলা থেকে যেসব কর্মী যাচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই প্রশিক্ষিত ও উচ্চ আয় করছেন। তবে গত কয়েক মাসে ঢাকা জেলায়ও প্রবাসী আয় আসা কমেছে। গত অক্টোবরে ঢাকা জেলায় প্রবাসী আয় এসেছে ৫০ কোটি ১৯ লাখ ডলার। জুলাইয়ে এসেছিল ৬৭ কোটি ১৯ লাখ ডলার। 

ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে চট্টগ্রাম জেলায়। এই জেলায় আয় আসা কমেছে ৪৬ শতাংশ। গত জুলাইয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রবাসী আয় এসেছিল ১৫ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। অক্টোবরে তা কমে হয়েছে ৮ কোটি ৬২ লাখ ডলার। 

ব্যাংকাররা বলছেন, চট্টগ্রাম জেলার কিছু ব্যবসায়ী বিদেশে রেমিট্যান্স হাউস কিনে ফেলেছেন। তাঁরা শ্রমিকদের থেকে আয় সংগ্রহ করলেও তা বৈধ পথে দেশে পাঠাচ্ছে না। তবে দেশ থেকে ঠিকই দ্রুতসময়ে সুবিধাভোগীদের কাছে পাঠানো অর্থ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আবার এই অঞ্চলে হুন্ডি চক্রও বেশি সক্রিয়। আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপের কারণে এখন প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারকে বেছে নিয়েছেন অনেকে। 

প্রবাসী আয় আসার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে কুমিল্লা জেলা। জুলাইয়ে এ জেলায় প্রবাসী আয় এসেছিল ১১ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। অক্টোবরে তা কমে হয়েছে ৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। সিলেট জেলায় গত জুলাইয়ে এসেছিল ১০ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। অক্টোবরে তা নেমে আসে ৭ কোটি ২৭ লাখ ডলারে। নোয়াখালী জেলায় জুলাইয়ে প্রবাসী আয় এসেছিল ৬ কোটি ৪২ লাখ ডলার। অক্টোবরে তা নেমে আসে ৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। দিনাজপুর জেলায় জুলাইয়ে এসেছিল ২ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। অক্টোবরে তা নেমে আসে মাত্র ৪১ লাখ ডলারে। 

ব্যাংকাররা বলছেন, আগে প্রবাসী আয় আসার দিক থেকে শীর্ষে ছিল সিলেট। 

 বর্তমানে বৈধপথে প্রবাসী আয়ে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো আর্থিক সুবিধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত
নিয়েছে ব্যাংকগুলো। আর বর্তমানে হুন্ডিতে অর্থ পাঠালে ডলারের দাম পাওয়া যাচ্ছে ১১০ টাকার বেশি। আবার তা তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে যাচ্ছে প্রাপকের কাছে। ফলে অনেকেই বৈধ পথের বদলে হুন্ডিতে প্রবাসী আয় দেশে পাঠাচ্ছেন বলে ধারণা খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।