২০৩৫ সালে কর-জিডিপির লক্ষ্য ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ
জাতীয় কর ব্যবস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির তুলনায় কর আদায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এখন ৬ শতাংশের ঘরে রয়েছে। একইভাবে মোট রাজস্ব আয়ের মধ্যে শুল্কের অবদান ২৮ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্তবিষয়ক প্রতিবেদনের ওপর সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় উঠে আসে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। উন্নয়নের জন্য করনীতি: কর ব্যবস্থা পুনর্গঠনের সংস্কার কর্মসূচি—শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়নি। পর্যালোচনা শেষে এটি প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।
পিআরআইয়ের ঢাকার বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন পিআরআই চেয়ারম্যান ও টাস্কফোর্সের প্রধান জাইদি সাত্তার। এ সময় টাস্কফোর্সের অন্য তিন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে টাস্কফোর্সের বিষয়বস্তু তুলে ধরে বলা হয়, জিডিপিতে প্রত্যক্ষ করের অবদান আড়াই শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালে ৯-১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। একইভাবে জিডিপিতে শুল্কের অবদান আড়াই শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। কর কাঠামোতে ন্যায্যতা আনতে প্রত্যক্ষ করের হার বাড়ানো হবে আর ব্যবসা সহজ করতে শুল্কহার কমানো হবে।
বর্তমানে বিদ্যমান পরোক্ষ ও সরাসরি করের অনুপাত ৭০ ও ৩০ থেকে ধাপে ধাপে ৫০ ও ৫০–এ উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে সরাসরি কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক—এই তিন প্রধান শুল্ক–কর খাতে মোট ৫৫টি অগ্রাধিকার বিষয় চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সরাসরি কর খাতে ৩২টি, ভ্যাটে ১০টি এবং বাণিজ্য কর খাতে ১৩টি নীতিগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে জাইদি সাত্তার বলেন, বর্তমান কর কাঠামো পর্যালোচনা করে ঘাটতিগুলো দেখার চেষ্টা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এখনকার কর কাঠামো খুবই জটিল এবং পরোক্ষ করে নির্ভরতা অনেক বেশি। উচ্চ শুল্কহার থাকার কারণে বিনিয়োগ এবং ভোগ সবকিছুই বাধাগ্রস্ত হয়।
জাইদি সাত্তার বলেন, ‘গত ৩০ বছরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আমাদের কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল। তাই বাণিজ্য বাধা দূর করে শুল্কহার কমিয়ে আনার প্রস্তাবনা দিয়েছি আমরা।’
বাণিজ্য বাধা দূর করার বিষয়ে জাইদি সাত্তার বলেন, স্থানীয় সুরক্ষার কারণে রপ্তানির চেয়ে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রিকে বেশি লাভজনক মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তাই দুই-তিনটি পণ্য ছাড়া বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাত গড়ে উঠছে না। পোশাকে একক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্য বাধা দূর করতে না পারলে এলডিসি উত্তরণ–পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে অ্যান্টি ডাম্পিংয়ের মুখে পড়তে হবে বলেও সতর্ক করেন এ অর্থনীতিবিদ।
ভ্যাট সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন টাস্কফোর্সের সদস্য ও কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে একক ভ্যাট হারের দিকে হবে, তবে এখন দুটি হার হতে পারে। এখন বাংলাদেশে সাত থেকে আটটি ভ্যাট হার চালু রয়েছে।
করবিষয়ক পরামর্শক ও টাস্কফোর্সের সদস্য স্নেহাশীষ বড়ুয়া করপোরেট করের বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের প্রত্যক্ষ করের হার মাত্র সাড়ে ৩৩ শতাংশ। প্রত্যক্ষ কর ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হলে ব্যক্তিগত আয়করের হার ২৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। সম্পদ স্থানান্তরের বিদ্যমান করহার ৫০ শতাংশ হ্রাস করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রিটার্ন জমা না দিলে লেনদেনের ওপর ৪ শতাংশ জরিমানার বিধান থাকলেও তার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে জানান টাস্কফোর্সের আরেক সদস্য ও আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মেহেদী হাসান। এ জন্য পর্যাপ্ত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার পরামর্শ দেন দিন।
অনুষ্ঠানে আরও কথা বলেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক বজলুল হক খন্দকার ও পরিচালক আহমদ আহসান।