মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি এসব দেশে মূল্যস্ফীতিও বাড়াতে পারে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এই সামরিক সংঘাত ইতিমধ্যে রণক্ষেত্র ছাড়িয়ে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি–সংকট বেড়েছে।

এ অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এডিবি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ–শৃঙ্খল ও বাণিজ্যে বিঘ্ন, দেশে দেশে আর্থিক বাজারে কড়াকড়ি এবং পর্যটন ও প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) নেতিবাচক প্রভাব।

এডিবির প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সম্ভাব্য সময়কালের বিপরীতে জ্বালানি তেলের দাম, গ্যাসের দাম, জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আগামী জুন মাস পর্যন্ত (স্বল্পমেয়াদি) সংঘাত চললে জ্বালানি তেলের দাম সাময়িকভাবে বেড়ে প্রতি ব্যারেল গড়ে ১০৫ মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মাঝারি মেয়াদি) সংঘাত চললে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তেলের দাম বেড়ে ১৩০ ডলার হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রে গ্যাসের দামও কিছুটা বাড়বে।

করণীয় বিষয়ে এডিবির সুপারিশ
*
জ্বালানির দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না করে আংশিকভাবে বাজারভিত্তিক করা।
* জ্বালানি সাশ্রয়ে এসির তাপমাত্রা নির্ধারণ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, সময় ভাগ করে অফিস চালু করা।
* গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ এবং নগরে ছুটির দিনে গাড়িমুক্ত দিন চালুর উদ্যোগ নেওয়া।

অন্যদিকে জ্বালানি বাজারের এই সংকট এক বছরের বেশি সময় স্থায়ী হলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তেলের দাম ১৫৫ ডলারের বেশি হয়ে যাবে। পাশাপাশি ২০২৬-২৭ বছরে এশীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে এডিবি। তবে এডিবি এ–ও বলেছে, এসব প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে সংঘাত কত দিন স্থায়ী হয় তার ওপর।

প্রতিবেদনে এডিবি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে।

এডিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট পার্ক বলেন, জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে তা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরে বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। এ জন্য সরকারগুলোর উচিত বাজারের অস্থিরতা কমানো, দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষা দেওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য শক্তিশালী নীতি গ্রহণ করা।

বিশ্লেষণে চারটি প্রধান নীতিগত পরামর্শ দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটি বলেছে, জ্বালানির দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না করে আংশিকভাবে বাজারভিত্তিক করা উচিত, যাতে সাশ্রয় ও বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ে। দরকার হলে নির্দিষ্টভাবে দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত খাতে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। তবে তা সীমিত সময়ের জন্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উচিত বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখা ও মূল্যস্ফীতির দিকে নজর রাখা। তবে অতিরিক্ত কঠোর নীতি এড়িয়ে চলা উচিত হবে।

এডিবি বলেছে, সরকারগুলোকে যেখানে সম্ভব জ্বালানির চাহিদা কমাতে উদ্যোগ নিতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) তাপমাত্রা নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় আলো কমানো, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, বাসা থেকে কাজ বা সময় ভাগ করে অফিস চালু করা। এ ছাড়া গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং নগর এলাকায় ছুটির দিনে গাড়িমুক্ত দিন চালুর মতো পদক্ষেপ নেওয়া।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে উদ্ভূত অর্থনৈতিক ও আর্থিক চাপ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা বা ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে এডিবি। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই সহায়তার অর্থ দ্রুত বিতরণযোগ্য, প্রয়োজন অনুযায়ী এই সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো হবে। এ ছাড়া সহজ শর্তে এই অর্থ দেওয়া হবে। এর মধ্যে যেমন বাজেট সহায়তা থাকছে, তেমনি থাকছে বাণিজ্য ও সরবরাহ অর্থায়নের মাধ্যমে জরুরি পণ্য, যেমন এখন তেল আমদানিতে সহায়তা।

এডিবির সহায়তার দুটি প্রধান দিক আছে। প্রথমত, বাড়তি আর্থিক চাপ মোকাবিলায় সরকারগুলোকে দ্রুত বাজেট সহায়তা দেওয়া হবে। সে জন্য ব্যাংকের ‘কাউন্টারসাইক্লিক্যাল সাপোর্ট ফ্যাসিলিটি’ ব্যবহার করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করা হবে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য ও সরবরাহ অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিয়ে জ্বালানি, খাদ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি সচল রাখা হবে। বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় এই কর্মসূচির আওতায় সীমিত সময়ের জন্য তেল আমদানিতে সহায়তা আবার চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।