আইএমএফের এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বাধীন দলটি ৯ দিনের সফরে ঢাকায় আসে ১২ জুলাই; আজ শুক্রবার দলটির চলে যাওয়ার কথা। এ ফাঁকে দলটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইত্যাদি দপ্তরের সঙ্গে বসেছে।

এমন এক সময়ে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের এ সফর, যখন চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বয়স মাত্র তিন সপ্তাহ। দক্ষিণ এশিয়ার শত ভাগ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দেশ শ্রীলঙ্কা প্রায় দেউলিয়া। বাংলাদেশও আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে সব ধরনের ব্যয় সংকোচন বা কৃচ্ছ্রসাধনের পথে আছে। আবার আইএমএফ থেকে তিন বছরে বাজেট সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশ ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার পেতে চায় বলে একটি অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হয়ে আছে।

আইএমএফের দলটির সঙ্গে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে—গতকাল বৈঠক শেষে দপ্তর থেকে চলে যাওয়ার সময় তা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আইএমএফ দলের সঙ্গেই কথা বলার পরামর্শ দেন সাংবাদিকদের। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আইএমএফকেই জিজ্ঞাসা করুন। তাদের পুরো দলটি আছে। আমরা তো আছি। পরেও জানতে পারবেন।’ আইএমএফ তো একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েই সব জানাবে, এ তথ্য জানালে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘তারা বিজ্ঞপ্তি যেটা দেবে, সেটিই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য।’

ব্যয় সাশ্রয় বা কৃচ্ছ্রসাধন নিয়ে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়ে অর্থমন্ত্রী কিছু বলবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আমরা সবাই বলছি। যেটা বলা হচ্ছে, প্রয়োজনীয় প্রকল্প ছাড়া বাকিগুলোর বাস্তবায়ন পিছিয়ে দিতে হবে। অন্তত যতগুলো সম্ভব।

এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে এ, বি ও সি শীর্ষক শ্রেণি করে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, যেসব প্রকল্প অত্যন্ত জরুরি এবং যেগুলোর কাজ শুরু হয়ে গেছে, সেগুলো চলবে। বাকিগুলো বাদ দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘না। বাদ দেব কেন?’

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম আইএমএফ থেকে সাহায্য নেওয়ার কথা বলেছেন, এ বিষয়টি উত্থাপন করলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সাহায্য তো নেওয়া হচ্ছে। অনেক কাজই করা হচ্ছে তাদের সাহায্য নিয়ে। তারা যা বলে তা করাও হয়। যেমন ভ্যাট আইন করার ধারণা তাদের কাছ থেকেই এসেছে।’ আর্থিক সহায়তা যখন লাগবে, তখন সবাই জানতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ ও ইআরডির সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইএমএফের স্টাফ মিশন আজ চলে যাওয়ার পর বাজেট সহায়তা চেয়ে আইএমএফের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠাবে সরকার। এর পর ঋণের শর্ত নিয়ে বৈঠক করতে আরেকটি দল আসবে। ওই দলের নেতৃত্ব দেবেন আইএমএফের ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা অংশের নির্বাহী পরিচালক সুরজিৎ ভালা। অনুমোদন পেলে দেশের ইতিহাসে আইএমএফ থেকে পঞ্চমবারের মতো ঋণ নেওয়া হবে এবার।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ থেকে সরকার প্রথমবার ঋণ নিয়েছিল ১৯৯০-৯১ সময়ে। এরপর ২০০৩-০৪, ২০১১-১২ ও সর্বশেষ ২০২০-২১ সময়েও তাদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়। তবে কোনোবারই তা ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়নি। ১৯৪৫ সালে গঠিত আইএমএফের বর্তমান সদস্য ১৯০ এবং ১৯৭২ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ এর সদস্য।

আইএমএফ থেকে বাংলাদেশ বছরে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার যোগ্য। বর্ধিত ঋণ সহায়তা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় গঠিত সহনশীলতা ও টেকসই তহবিল (আরএসএফ)—এই তিন কর্মসূচি থেকে ঋণ চাইবে বাংলাদেশ।

যদিও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পর গত বুধবার অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এ মুহূর্তে বিদেশি ঋণের প্রয়োজন নেই। আর এ দফায় বাংলাদেশকে ঋণ দিতে আইএমএফ আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়নি, বাংলাদেশও প্রস্তাব পাঠায়নি। ঋণ নিলেও দেশের স্বার্থের পরিপন্থী বা নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু করা হবে না।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন