বর্তমানে দেশে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান জামানতবিহীন অতিক্ষুদ্র ঋণ বা ন্যানো লোন দিচ্ছে। এতে দেখা যায়, জামানতবিহীন ছোট ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার জামানতসহ বিতরণ করা ঋণের খেলাপির হারের চেয়ে কম। যদিও অনেক ব্যাংকার জামানতসহ ঋণ দেওয়াকে স্বস্তিকর মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক গোলটেবিলে বক্তারা এ কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে অর্থায়নের সুযোগ: বেসরকারি খাতের জন্য আরও সহায়ক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ও এসএমই ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ আবদুল মোমেন এবং এইচএসবিসি ব্যাংকের হেড অব মাল্টিন্যাশনাল হোলসেল ব্যাংকিং আন্দালিব মির্জা। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতের অংশীজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ব্র্যাক ব্যাংকের এএমডি সৈয়দ আবদুল মোমেন জানান, ব্র্যাক ব্যাংকের মোট সম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতে, যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা জামানতবিহীন ঋণ। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে জামানত রয়েছে। জামানতবিহীন ৪০ হাজার কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার মাত্র ২ শতাংশ। আর জামানতসহ ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণে খেলাপির হার ৭ শতাংশ।
সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, ‘জামানতসংক্রান্ত বিষয়টি একটি ধারণাগত সমস্যা। ব্যাংক মনে করে, জামানত দিলেই আমি ঝুঁকিমুক্ত বা সুরক্ষিত হয়ে গেলাম। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টি তা নয়। জামানত ব্যাংককে তেমন কোনো সুবিধা দেয় না। এটি একধরনের মানসিক প্রশান্তি।’
এ প্রসঙ্গে কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো বড় ধরনের ঋণবৈষম্য রয়েছে। বর্তমানে দেশের ৮০ শতাংশের বেশি ঋণসুবিধা পাচ্ছে বৃহৎ করপোরেট খাত। অথচ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’
তবে ঋণ পেতে ব্যবসায়ীদেরও স্বচ্ছ আর্থিক বিবরণী রাখা প্রয়োজন বলে জানান ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ। তিনি বলেন, প্রথাগতভাবে ব্যবসায়ীরা ধরে নেন ব্যাংকে গেলেই ঋণ পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের হিসাব খাতা এতই বিশৃঙ্খল থাকে যে তা দেখে কোনো ব্যাংকারের পক্ষে ঋণ অনুমোদন করা কঠিন হয়।
অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, সরকার এখন সৃজনশীল অর্থনীতির কথা বলছে। জামালপুরের হস্তশিল্প বা নকশিকাঁথার মতো আঞ্চলিক সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের আগামী দিনে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে অর্থায়নের বিকল্প নেই। এখনো মোট লেনদেনের ৭২ শতাংশই নগদ লেনদেন। ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট খাতের প্রতিযোগীরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সবার প্রধান শত্রু হলো ‘ক্যাশ’।
পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান বলেন, খেলাপি ঋণের ধাক্কায় কাবু হয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন মূল ব্যবসায়িক খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে ট্রেজারি বন্ড বা সরকারকে ঋণ দেওয়াকেই নিরাপদ মনে করছে। বর্তমানে বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংকের আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসছে সরকারি বন্ড থেকে। অন্যদিকে দেশের ব্যাংকঋণ এখনো স্থাবর সম্পদ বা জমিজমার হিসাবেই আটকে আছে।